বেড়ে চলেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ: সেপ্টেম্বরে মৃত্যু তিন গুণ
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Sunday, 20 September, 2026, 11:06 AM সর্বশেষ আপডেট: Sunday, 20 September, 2026, 11:11 AM
বেড়ে চলেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ: সেপ্টেম্বরে মৃত্যু তিন গুণ
দেশে ডেঙ্গু রোগের ভাইরাসের সংক্রমণ এবং মৃত্যু বাড়ছেই। জুনে রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়, তা চলতি মাসে আরও বেড়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন গড়ে সোয়া এক হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সংখ্যা আগস্টের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। চিকিৎসাধীন রোগীর মৃত্যুও বেড়েছে তিন গুণের বেশি। চলতি মাসের এ পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে চারজনের বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে ৬০ হাজার ৩৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর ১৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৩ হাজার ১৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এরপর বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকে। জুনে ২ হাজার ৯০৭, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬, আগস্টে ২০ হাজার ৫৩৬ এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনে ২৪ হাজার ৫৩৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৫, জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরের ১৯ দিনে ৮১ জন চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগী মারা গেছে। গত তিন বছরের আগস্টের মধ্যে গত আগস্টেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার গতিও দ্রুত হচ্ছে। আগস্টে প্রতিদিন গড়ে ৬৬২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর সেপ্টেম্বরের গতকাল পর্যন্ত দৈনিক গড়ে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৯১ জন। অর্থাৎ দৈনিক রোগী ভর্তি বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আগস্টে প্রতিদিন গড়ে মৃত্যু হয়েছে ১ দশমিক ৪ জনের। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ২৬ জন। অর্থাৎ দৈনিক গড় মৃত্যু বেড়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৭ গুণ। গত বছরের চেয়ে রোগী ৪৮% বেশি
গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেকটাই বেশি। ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬০ হাজার ৩৭৯ জন। গত বছরের একই সময়ে ভর্তি ছিল ৪০ হাজার ৭০৯ জন। অর্থাৎ এক বছর পর একই সময়ে রোগী বেড়েছে ১৯ হাজার ৬৭০ জন বা ৪৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। তবে মৃত্যু বেড়েছে তুলনামূলকভাবে কম হারে—২০২৫ সালের একই সময়ে ১৬৭ জনের মৃত্যুর বিপরীতে এবার ১৭৮ জন; বৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
তবে রোগতত্ত্ববিদেরা বলেন, মৃত্যুর সংখ্যা শুধু সংক্রমণের মাত্রার ওপর নির্ভর করে না। রোগী কত দেরিতে হাসপাতালে আসছে, আসার সময় রোগের তীব্রতা কতটা, সতর্কতার চিহ্ন ছিল কি না এবং চিকিৎসা কত দ্রুত শুরু হয়েছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।
আগে থেকেই সতর্কতা ছিল
জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই সতর্ক করছিলেন যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বেশ খারাপ হতে পারে। চলতি মাসের শুরু থেকে হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক বাড়তে শুরু করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার সম্প্রতি মিডিয়াকে বলেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ চলতি বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) গত চার বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে দেশের কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার বাইরে বান্দরবান, বরিশাল বিভাগের সব জেলা, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর ও খুলনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ কমাতে এখনই মশা নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। সরকারি কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা বা ব্যর্থতার পাশাপাশি ডেঙ্গুর অনিয়ন্ত্রিত প্রকোপের জন্য নাগরিক সমাজের অসচেতনাকেও দায়ী করছেন তাঁরা। পরিস্থিতি মোকাবিলার লক্ষ্যে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাসের জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর উদ্বোধন করেছেন।
ঢাকার বাইরে রোগী বাড়ছে
ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত ১৪ হাজারের কিছু বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। রাজধানীর বাইরে ঢাকা বিভাগে ৯ হাজার ৯৯৭, খুলনায় ৯ হাজার ৯০৩, চট্টগ্রামে ৮ হাজার ৬৭২, বরিশালে ৮ হাজার ৪৬৭, রাজশাহীতে ৩ হাজার ৬৩৮, ময়মনসিংহে ৩ হাজার ৩৬৬, রংপুরে ১ হাজার ৭৬২ এবং সিলেটে ২৭৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সরকারি তথ্যের সঙ্গে গত বছরের একই সময়ের তথ্য তুলনা করে দেখা যায়, গত বছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনা ছিল ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাবস্থল। এবার সেই জায়গা নিয়েছে খুলনা।
২০১৯-২০২৩ সালের জেলা-ভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করা এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় সংক্রমণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত থাকলেও পরে অন্যান্য অঞ্চলে রোগীর অংশ বেড়েছে। ২০১৯ সালে ঢাকা শহরে ছিল দেশের মোট রোগীর প্রায় ৫১ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৩৪ শতাংশে।
খুলনা বিভাগে এ বছর সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে এ বিভাগে।
মোকাবিলায় কৌশল বদল চাই
২০০০-২০২২ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৪ সালে এনটোমোলজিক্যাল সোসাইটি অব আমেরিকার পক্ষ থেকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস প্রকাশিত জার্নাল অব মেডিকেল এনটোমোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১-২০২২ সময়ে বার্ষিক ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আগের দশকের তুলনায় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও আগের মাসগুলোর বৃষ্টিপাতের সঙ্গেও সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় আরও ইঙ্গিত মিলেছে, নির্দিষ্ট এলাকা ও সময়ে রোগীর ঘনত্ব বেশি থাকায় লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
আইইডিসিআর এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হাসপাতালের বাইরে রোগী থাকলে বা কোনো রোগীর মৃত্যু হলে তা আমাদের জানা থাকছে না। কিন্তু শুধু হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু বিবেচনায় নিয়ে একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বোঝা যায় না। হাসপাতালের বাইরে রোগী ও রোগ ব্যবস্থাপনায় উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাইরে সংক্রমণ বৃদ্ধিকেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ডা. মোশতাক হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ‘ঢাকার বাইরে কোনো এলাকায় সংক্রমণ বাড়লে শুধু রোগীর সংখ্যা নয়, কেন বাড়ছে সেটিও খুঁজে বের করতে হবে। বরগুনায় যেসব কারণে সংক্রমণ বেশি হয়েছিল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট ও খুলনায়ও একই কারণ কাজ করছে কি না, তা মাঠপর্যায়ে তদন্ত করা দরকার।’
গত বছর উপকূলীয় জেলাগুলোতে সংক্রমণ বেশি হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সে সময়ে করা আইইডিসিআরের গবেষণার ফল কাজে লাগাতে হবে। কোনো এলাকায় এডিসের প্রজননস্থল ও সংক্রমণের কারণ শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সমন্বিত মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।’
ডেঙ্গু রোগী বেশি এমন এলাকায় কমিউনিটি (স্থানিক) পর্যায়ে পরীক্ষার ব্যবস্থা করার তাগিদ দেন তিনি।
সংক্রমণের গতিপথ নিয়ে উদ্বেগ
অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গু সংক্রমণের গতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ভাবিত। দেশের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণে আগস্টকে ডেঙ্গুর অন্যতম উচ্চ-সংক্রমণের মাস হিসেবে পাওয়া গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংক্রমণের চূড়ার সময় পরিবর্তিত হয়েছে। অন্যতম কারণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও আগের মাসগুলোর বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে আগের বছরের তুলনায় সংক্রমণের চূড়া আগেই এসেছিল এবং জুলাইয়ের মধ্যেই দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছিল।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, চলতি বছরের তথ্যও উদ্বেগের কারণ তৈরি করছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৯ দিনেই ভর্তি রোগীর সংখ্যা আগস্ট মাসকে ছাড়িয়েছে। ফলে অক্টোবরের শুরুতে সংক্রমণের গতি কোন দিকে যায়, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, কয়েক দশক ধরে ডেঙ্গুকে হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এখনো তাই হচ্ছে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বেশি। তবু প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না। ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করা স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে এখনো সমন্বয় হয়নি। অন্তত মাঠপর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এখন যে পরিস্থিতি তাতে অক্টোবর আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করতে জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন, কিন্তু সরকার তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান চলছে
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইইডিসিআর মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করছে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে চিকিৎসাসেবায় এখন পর্যন্ত কোনো ঘাটতির তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা আরও জোরদার করা হবে।’