ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ার ‘শাস্তি’, মায়ের সঙ্গে ১৫ মাসের শিশুর কারাবাস
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Saturday, 12 September, 2026, 4:43 PM
সর্বশেষ আপডেট: Saturday, 12 September, 2026, 5:18 PM

স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ার ‘শাস্তি’, মায়ের সঙ্গে ১৫ মাসের শিশুর কারাবাস

স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ার ‘শাস্তি’, মায়ের সঙ্গে ১৫ মাসের শিশুর কারাবাস

স্বামী হত্যার বিচার চেয়েছিলেন ফাতেমা বেগম। স্বামী হত্যা মামলার এক আসামির পরিবারের করা মামলায় এখন কাঠগড়ায় ফাতেমা। অভিযোগ উঠেছে, সাজানো কথিত ভাঙচুর ও লুটপাট মামলায় ১৫ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে সাতদিন কারাগারেও কাটাতে হয়েছে তাকে। 

মায়ের অনুপস্থিতিতে প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই মেয়ের ঠাঁই হয়েছে এতিমখানায়। অথচ যে মামলার পর এই পালটা মামলা, সেই স্বামী হত্যাকাণ্ডের কথাই নেই পরবর্তী মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে। 

নথিতে কাশেমকে ফাতেমার স্বামী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি। আবার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, ভাঙচুরের প্রমাণ পেলেও কারা তা করেছে, তিনি জানেন না।

ফাতেমার স্বামী মোহাম্মদ কাশেম ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় নিহত হন। পরদিন ফাতেমা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় মো. রাসেলসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দেন। এতে ৪ নম্বর আসামি মো. রাসেলকে হত্যাকারীদের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফাতেমার অভিযোগ, স্বামী হত্যার মামলা তুলে নিতে তাকে কয়েক দফা হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মহেশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন তিনি। এরপর রাসেলের মা নূর জাহান বেগম ফাতেমা ও তার পরিবারের আরও ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয় ফাতেমাকে। খোদ মামলার সাক্ষীরা দাবি করেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি’ তারাও এমন সাক্ষ্য দেননি।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট নূর জাহান বেগম মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ করেন, ২৪ মে সকাল ৮টার দিকে ফাতেমাসহ সাতজন তাদের বাড়িতে হামলা চালান। এ সময় ঘরবাড়ি ভাঙচুর, মারধর ও মালামাল লুট করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

আদালতের নির্দেশে অভিযোগটি তদন্ত করেন মহেশখালী থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম। ১০ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

হত্যাকাণ্ড পুলিশ কর্মকর্তার চোখে শুধু তর্ক সীমাবদ্ধ 


ফাতেমার বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের শুরুতে বাদী-বিবাদীর মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ ও তর্ক-বিতর্কের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ফাতেমার স্বামী মোহাম্মদ কাশেমের হত্যাকাণ্ডের কোনো উল্লেখ নেই।

অথচ কাশেম হত্যাকাণ্ডই দুই পরিবারের বিরোধের মূল প্রেক্ষাপট। ওই হত্যাকাণ্ডের মামলায় রাসেল আসামি এবং অভিযোগপত্রেও তাকে হত্যাকারীদের অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, যে হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে ফাতেমা মামলা করেছিলেন, ওই মামলার একজন আসামির পরিবারের করা মামলাতেই পরে আসামি হন তিনি।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এজাহার ও তদন্ত প্রতিবেদনে কাশেমকে ফাতেমার স্বামী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার নিহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। নথির বর্ণনায় তাকে জীবিত ব্যক্তির মতো উপস্থাপন করা হয়েছে। 

তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাদী-বিবাদীর মধ্যে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ থাকলেও মারামারির মতো বড় কোনো ঘটনা আগে ঘটেনি।

অভিযোগ রয়েছে, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ফাতেমা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে জেনেশুনে মিথ্যা মামলায় প্রতিবেদন দেন মোজাহেরুল ইসলাম। 

একইভাবে আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে লোকজনকে ধরে ধরে আদালতে চালান করেন তিনি।

অসহায় মা থেকে নথিতে ‘মারাত্মক অস্ত্রধারী’

তদন্ত প্রতিবেদনের আরেক অংশে ফাতেমা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ভয়াবহ সব অভিযোগ। বাস্তব জীবনে স্বামীহারা, তিন সন্তান নিয়ে মানুষের সহায়তায় চলা ফাতেমাকে ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে দলবদ্ধভাবে ‘মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র’ নিয়ে হামলা চালানো একটি সশস্ত্র দলের সদস্য হিসেবে।

প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, বিবাদী ফাতেমা বেগম গং দলবদ্ধভাবে মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বাদীর বসতঘরে হামলা চালিয়ে দেয়াল, দরজা ও জানালা ভাঙচুর করে তছনছ করেন। বাদীর পুত্রবধূ ফারজানা আক্তারকে মারধর করে ঘর থেকে বের করে দেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন। এ সময় ঘর থেকে ৮ আনা ওজনের স্বর্ণের চেইন, নগদ ২০ হাজার টাকা, বিভিন্ন কার্ড, পাসপোর্ট ও আসবাবপত্রসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে এবং টিন ও মাটির দেয়াল ভেঙে আনুমানিক ১ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেন। এ বিষয়ে মামলা বা কাউকে জানালে বাদী ও তার পরিবারকে মারধর ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেন।

আমরা কোনো সাক্ষ্যই দেইনি

তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের বক্তব্য ও প্রতিবেদনের সঙ্গে মেলে না। মামলার স্বাক্ষী নূরুন্নাহার, মুন্নি আক্তার ও মোতাহারা বেগম বলেন, ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর বা লুটপাটের কোনো ঘটনা তারা দেখেননি। তদন্ত কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে ওই ঘটনার বিষয়ে কোনো জবানবন্দিও নেননি বলে দাবি করেন তারা। কীভাবে তাদের নাম সাক্ষী হিসেবে প্রতিবেদনে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না।

তাদের ভাষ্য, কাশেম হত্যার পর ২৩ এপ্রিল ক্ষুব্ধ লোকজন রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিল বলে তারা শুনেছেন। তবে ওই ঘটনার সঙ্গে কাশেমের পরিবার জড়িত ছিল না বলেও দাবি করেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম ও মোতাজ্জেম বেগমও ২৪ মে ফাতেমা বা তার পরিবারের লোকজনের ভাঙচুর কিংবা লুটপাট দেখেননি বলে জানান।

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা তার জানা নেই। তবে কাশেম হত্যার পর ক্ষুব্ধ লোকজন ওই বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিল বলে তিনি শুনেছেন।

চেয়ারম্যানের ভাষ্য, কাশেম ও রাসেল আত্মীয়। অল্প কিছু টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। তার ধারণা, কাশেম হত্যা মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই ফাতেমার পরিবারের বিরুদ্ধে পালটা মামলাটি হয়ে থাকতে পারে।

স্থানীয় একটি মসজিদের ইমামও ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে সাজানো বলে মনে করেন। তার দাবি, স্বামী হারানোর পর অসহায় অবস্থায় থাকা ফাতেমা ও তার পরিবারকে হয়রানি করা হচ্ছে।

ভাঙচুর কে করেছে, তা আমি জানি না

অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা, ভাঙচুর, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলা হলেও তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই বলছেন, ভাঙচুর কারা করেছে তা তিনি জানেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত প্রতিবেদন তার হাতে বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এজাহার অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছি। কোর্ট শুধু জানতে চেয়েছে- বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে কিনা। আমি সেটাই জানিয়েছি। রাসেলের বাড়িতে ফাতেমা ও তার পরিবারের লোকজনই ভাঙচুর ও লুটপাট করেছেন কি না, আমি জানি না।

তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘর ভাঙচুর এবং মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছেন। তবে কারা এসব করেছে, তা তিনি জানেন না। সাক্ষীরা এ বিষয়ে যা বলেছেন, প্রতিবেদনে তিনি সেটিই লিখেছেন বলে জানান। তবে ঘুসের বিনিময়ে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

মায়ের সঙ্গে সাতদিন কারাগারে ১৫ মাসের শিশু

গত ৩১ আগস্ট ফাতেমা, তার শ্বাশুড়ি রাশেদা বেগম ও নাসিমা আক্তারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে রাশেদা ও নাসিমা জামিন পান। ফাতেমা ১৫ মাসের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে যান।

ফাতেমার অন্য দুই মেয়ে রাজমিন আক্তার চতুর্থ শ্রেণির এবং মিশকাত জান্নাত প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মায়ের অনুপস্থিতিতে তাদের দেখাশোনার মতো কেউ না থাকায় কয়েকদিনের জন্য এতিমখানায় রাখতে হয় তাদের।

গত ৭ সেপ্টেম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইন ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেন। সাত দিন পর কারাগার থেকে বের হন তিনি।

ফাতেমা যুগান্তরকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, স্বামীকে হারিয়ে আমি আজ পাগলপ্রায়। তিনটি এতিম সন্তানকে দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। কখনো মানুষের কাছে হাত পেতে, কখনো কারও দেওয়া খাবারে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিই। নিজের থাকার ঠিকঠাক জায়গা নেই, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি। এমন অবস্থায় আমি কীভাবে অন্যের বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর করব? কারও ক্ষতি করার মতো শক্তি, সামর্থ্য বা লোকবল কোনোটিই আমার নেই। আমার দুই মেয়েকেই কয়েক দিনের জন্য নিরাপদে রাখার মতো এই দুনিয়ায় কোনো মানুষ নেই। অথচ আজ আমাকেই এমন একটি মামলায় জড়ানো হয়েছে, যে কাজ করার কথা আমি চিন্তাও করতে পারি না। স্বামী হত্যার বিচার চাওয়াই কি আমার অপরাধ?

এ বিষয়ে মহেশখালী থানার ওসি মো. সুলতান বলেন, ঘটনাটি আমার যোগদানের আগে ঘটেছে। তাই এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়ে পুলিশ কাউকে হয়রানি করে থাকলে ভুক্তভোগী আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। আদালতকে বিষয়টি জানালে আইন অনুযায়ী আদালত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status