|
নারী চালক-হেল্পারে বাসসেবা শুরু হয়েছিল কবে?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() নারী চালক-হেল্পারে বাসসেবা শুরু হয়েছিল কবে? প্রাথমিকভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রুটে ১০টি বাস দিয়ে এই সার্ভিস শুরু হচ্ছে। পাশাপাশি বগুড়ায় দুটি ও চট্টগ্রামে দুটিসহ আরও চারটি বাস যুক্ত হবে। যাত্রীচাহিদা বিবেচনায় ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও আছে। সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নারী যাত্রীরা তুলনামূলক স্বস্তিতে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষত অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী নারীদের জন্য, নারী চালক-কন্ডাক্টর নিয়োগের মাধ্যমে পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে। গণমাধ্যমগুলো একে ‘যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করলেও বাংলাদেশে নারীর গাড়ি চালানোর ধারার সূচনা কিন্তু আজকের নয়। এর শেকড় প্রোথিত প্রায় সাড়ে চার দশক আগে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের একটি সাহসী সিদ্ধান্তে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দশকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নারীদের সাইকেল ও মোটরগাড়ি চালানো এবং নিরাপত্তাকর্মীসহ নানা অপ্রচলিত পেশায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। যা তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি হয়। সেই বছর ছালেহা বেগম বাংলাদেশে প্রথম নারী গাড়িচালক হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং তাকে গাড়ি চালানো শিখিয়েছিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। অর্থাৎ দেশের প্রথম স্বীকৃত নারী চালক তৈরির কৃতিত্ব সরাসরি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের। এ উদ্যোগের পেছনে ছিল ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি নারীর ক্ষমতায়নে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই যে প্রতিষ্ঠানেই নতুন নিয়োগ হতো; সেখানে গ্রামীণ অসহায় নারীদের প্রতি তার অগ্রাধিকার থাকত। ফলে এভাবেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র হাসপাতালের কর্মীদের প্রায় ৪০ ভাগ নারী হয়ে ওঠেন। মজার ব্যাপার হলো, সত্তর-আশির দশকের বাংলাদেশে নারীর গাড়ি চালানো ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী ও প্রায় অকল্পনীয় একটি ঘটনা। এই সময়ের বর্ণনায় বলা হয়েছে, সেই দশকে নারীদের সাইকেল ও মোটরগাড়ি চালানো এবং নিরাপত্তাকর্মীর মতো পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ ছিল সমাজের প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ বিপরীত অভিনব ও ব্যতিক্রমী একটি পদক্ষেপ। তৎকালীন গ্রামীণ ও রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় গাড়ি চালানোকে দেখা হতো একচেটিয়াভাবে পুরুষের কাজ হিসেবে; নারীর জন্য প্রকাশ্যে রাস্তায় গাড়ি চালানো ছিল প্রচলিত পর্দাপ্রথা ও লিঙ্গভিত্তিক শ্রম-বিভাজনের ধারণার সরাসরি বিরোধী। এ কারণেই ছালেহা বেগমের মতো একজন নারী যখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রশিক্ষণে গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে নেন; তখন সেটি সমাজে বিস্ময়, সংশয় ও অনেক ক্ষেত্রে বিরূপ মন্তব্যের জন্ম দেয়, নারীর শালীনতা, নিরাপত্তা ও পারিবারিক মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হতো। গাড়ি চালানোর মতো ‘পুরুষালি’ কাজে নারীর সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হতো। এই দৃষ্টিভঙ্গি যে নিছক অতীতের বিষয় নয়, তারও প্রমাণ মেলে হালনাগাদ তথ্যে। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথোরিটির এক কর্মকর্তা সাম্প্রতিক এক আলোচনায় স্বীকার করেছেন, দক্ষ নারী বাসচালকের অভাবের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই এখনো এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একইভাবে সড়কে দুই চাকার বাহন চালানো নারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে করা এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এখনো অনেকেই মেয়েদের বাইক বা গাড়ি চালানো সহজভাবে নেন না, ফলে নারীদের প্রায়ই হয়রানির শিকার হতে হয়। অর্থাৎ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র যখন সত্তর-আশির দশকে নারীদের গাড়ি চালানো শেখানো শুরু করে; তখন এটি শুধু একটি দক্ষতা-প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ছিল না বরং এটি ছিল একটি প্রথাবিরোধী সামাজিক সাহস। যা সে সময়ের প্রচলিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। চার দশক পরও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। ‘জীবনের আগে জীবিকা নয়, সড়ক দুর্ঘটনা আর নয়, আমরা স্বচ্ছভাবে গাড়ি চালাতে চাই’ স্লোগান সামনে রেখেই চলছে এ প্রশিক্ষণ। তবে এখন শুধু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নয়, পরবর্তীতে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের উদ্যোগে সরকারের সহায়তায় শত শত নারীকে বিনামূল্যে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যদিও ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্সধারী নারীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলক কম। ফলে ধারাবাহিকতার প্রতিফলনের এই প্রেক্ষাপটে দেখলে, বিআরটিসির নতুন ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্ভাবন নয়। এটি একটি দীর্ঘ পথচলার সাম্প্রতিক পরিণতি। যার সূচনা করেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। স্বাধীনতার পরপরই যখন নারীর গাড়ি চালানো ছিল সামাজিকভাবে প্রায় অকল্পনীয় ও বিরূপ দৃষ্টিতে দেখা একটি বিষয়। ছালেহা বেগমের হাত ধরে যে ধারা শুরু হয়েছিল। প্রায় চার দশক পর তা এখন রাষ্ট্রীয় পরিবহন ব্যবস্থার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা নিশ্চিত ভাবেই আনন্দের। তবে এখনো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলায়নি। যা প্রমাণ করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সূচিত এই সংগ্রাম আজও অব্যাহত আছে। জারি থাকুক এই সংগ্রামের গল্প। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
