ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১ আগস্ট ২০২৬ ১৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি, সার ও এলএনজির সরবরাহে বড় সংকটের শঙ্কা—কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Saturday, 1 August, 2026, 4:46 PM

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি, সার ও এলএনজির সরবরাহে বড় সংকটের শঙ্কা—কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে জ্বালানি, সার ও এলএনজির সরবরাহে বড় সংকটের শঙ্কা—কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এতে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছে সরকার। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন দেখা দিলে একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন ও কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি আমদানি ব্যয়, ডলারের চাহিদা এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি তেলের কৌশলগত মজুত ৯০ দিনের চাহিদার সমপরিমাণে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের প্রচেষ্টাও জোরদার করা হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ, পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় জরুরি প্রস্তুতি শুরু হয়েছে।

এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকার ছয়টি দেশের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১৬ হাজার ৮০ কোটি টাকার জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমেও জ্বালানি তেল কেনা অব্যাহত থাকবে।

কর্মকর্তারা জানান, সরকার নতুন সার সরবরাহকারী দেশের সঙ্গেও আলোচনা করছে। বিশেষ করে যেসব দেশ থেকে পণ্য আনতে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর নৌপথ ব্যবহার করতে হয় না, সেসব দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জ্বালানি বিভাগ বেসরকারি অপারেটর ও বিপিসির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

এলএনজি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ

কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় এলএনজি। কারণ, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। 

এতদিন কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের এলএনজির চাহিদা পূরণ হতো।

কিন্তু সংঘাত শুরুর পর ওই উৎসগুলো থেকে সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখন ক্রমেই স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

জ্বালানি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্পট মার্কেট থেকে ধারাবাহিকভাবে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে।

গত ৩০ জুলাই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চলতি বছরের ৪২তম এলএনজি কার্গো আমদানির অনুমোদন দেয়। এতে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হয় ২২ দশমিক ৩৫ মার্কিন ডলার। কার্গোটির মোট মূল্য প্রায় ৯৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। বর্তমানে আরও দুটি এলএনজি কার্গো কেনার প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরের বাকি সময়ে আরও প্রায় ৬০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হবে।

বাংলাদেশের দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে (এফএসআরইউ) একসঙ্গে দৈনিক সর্বোচ্চ ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারে, যা বছরে প্রায় ১১৬টি এলএনজি কার্গোর সমপরিমাণ।তবে দুটি স্থাপনাই সবসময় সচল থাকে না।

সম্প্রতি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সেটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এতে এলএনজি পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের সক্ষমতা অর্ধেকে নেমে আসে এবং শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাসের সংকট দেখা দেয়।

গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গানভর ইউএসএ এলএলসি থেকে আগামী ১৩ বছরে ৭৮টি এলএনজি কার্গো আমদানির নীতিগত অনুমোদন দেয়।

প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে পেট্রোবাংলার যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, ওমান ও সৌদি আরবের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট সাতটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তি রয়েছে।

দেশে গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত এলএনজি আমদানির প্রয়োজন রয়েছে।

কর্মকর্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে শুধু চুক্তি ও পর্যাপ্ত অর্থ থাকলেই এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত হয় না।

সংঘাত শুরুর পর মার্চ মাসে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী বাংলাদেশে চুক্তি অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ না করে বেশি দাম পাওয়ায় অন্য দেশে কার্গো পাঠিয়ে দেয়।

এমনকি একটি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশ অভিমুখে রওনা হওয়ার পরও সেটিকে অন্য গন্তব্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

বিকল্প উৎস ও কৌশলগত জ্বালানি মজুত

সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্নের আশঙ্কা মাথায় রেখে সরকার অন্তত ৯০ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ কৌশলগত জ্বালানি তেলের মজুত গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

এই পরিকল্পনার আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জ্বালানি বহনকারী ট্যাংকার, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সংরক্ষণাগার, পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সংরক্ষণ সক্ষমতাও কাজে লাগানো হবে। লক্ষ্য হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ পরিবহন এবং অন্যান্য জরুরি সেবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, সংস্থাটি ৬৮ লাখ ৫৫ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা করেছে। দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হবে।

এছাড়া, চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার টন এলপিজি আমদানিরও পরিকল্পনা করেছে বিপিসি।

সারা বছর, বিশেষ করে ৬০ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত ধরে রাখা এখনো বড় একটি চ্যালেঞ্জ বলে বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্যও দেখাচ্ছে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে।

ফলে এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং সার কারখানাগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সার সংকটে কৃষিও ঝুঁকিতে

সরকারের মতে, কৃষি খাতেও বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ রাসায়নিক সার—বিশেষ করে ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। অন্যদিকে, দেশীয় উৎপাদন দিয়ে ইউরিয়ার চাহিদার কেবল একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে বছরে ইউরিয়ার চাহিদা ২৬ লাখ টন, ডিএপির ১৫ লাখ ২০ হাজার টন, এমওপির ১০ লাখ ১০ হাজার টন এবং টিএসপির ৭ লাখ ৬৫ হাজার টন। দেশীয় কারখানাগুলো বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ইউরিয়া উৎপাদন করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাসের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প উৎস থেকে সার, জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে এর কোনো বিকল্প নেই।'

কৃষি সচিব জানান, বাংলাদেশ এখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত সরবরাহকারীদের পরিবর্তে ব্রুনাই, মরক্কো, মালয়েশিয়া ও চীনের মতো দেশের দিকে ঝুঁকছে। পাশাপাশি কানাডা ও তিউনিসিয়ার সঙ্গেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ওমানের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, 'সরকার কৃষি খাতের প্রয়োজনীয় উপকরণ আমদানি ও মজুত নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এই মুহূর্তে ব্যয় প্রধান বিষয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরবরাহ নিশ্চিত করা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম আরও বেড়ে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দ্বিতীয় দফা চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তাদের মতে, এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য বৃদ্ধি পেলে আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

তারা আরও বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এবং শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা বলেন, অতীতের বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের আমদানি বিল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হারও চাপের মুখে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারের তাৎক্ষণিক দুটি অগ্রাধিকার হলো—যেকোনো পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যতটা সম্ভব সীমিত রাখা।

তবে তারা স্বীকার করেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রয়োজনীয় জ্বালানি, এলএনজি ও সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status