বারান্দার পাশেই ট্রান্সফরমার, এক মুহূর্তেই বদলে গেল পাঁচ বছরের নিহানের জীবন
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Thursday, 30 July, 2026, 8:55 PM
বারান্দার পাশেই ট্রান্সফরমার, এক মুহূর্তেই বদলে গেল পাঁচ বছরের নিহানের জীবন
বৃষ্টিভেজা দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতি দেখছিল পাঁচ বছরের শিশু নিহান। খেলার ছলে ব্যালকনির গ্রিলে হাত রাখতেই বিকট শব্দ। মুহূর্তেই বিদ্যুতের তীব্র শকে ঝলসে যায় তার দুই হাত ও বুকের অংশ। আট দিনের জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে কেটে ফেলতে হয়েছে তার বাম হাত।
মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুর মহানগরের উত্তর ছায়াবীথি শ্মশান মোড় এলাকায়। এ ঘটনায় বাড়ির মালিকের অবহেলা, আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা এবং বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার স্থাপনের নিয়ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২০ জুলাই সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। ঝড়-বৃষ্টি উপভোগ করতে বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল নিহান। হঠাৎ ব্যালকনির গ্রিলে হাত দিতেই বিদ্যুতায়িত হয় সে। তার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন মা। পরে বাবা খায়রুল ইসলাম দ্রুত তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।
চিকিৎসকরা জানান, উচ্চমাত্রার বৈদ্যুতিক শকে নিহানের হাত ও বুক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে বাম হাতে পচন ধরায় জীবন বাঁচাতে কনুইয়ের নিচ থেকে হাতটি কেটে ফেলতে হয়।
নিহানের বাবা খায়রুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় তিন বছর ধরে ওই ভবনের তৃতীয় তলায় ভাড়া থাকছেন। চলতি বছরের মার্চে ছুটি শেষে ফিরে এসে দেখেন, তাদের বারান্দার মাত্র তিন ফুট দূরে তিনটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বসানো হয়েছে।
তার দাবি, বিষয়টি বাড়ির মালিকের স্ত্রী, দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বজন এবং কেয়ারটেকারকে একাধিকবার জানিয়ে ব্যালকনিতে গ্লাস লাগানোর অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু বারবার আশ্বাস দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। খায়রুল ইসলামের ভাষায়, “সময়মতো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিলে আজ আমার ছেলেকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হতে হতো না।”
বাড়ির কেয়ারটেকার শাহাদাৎ হোসেন জানান, ঘটনার দিন কান্নার শব্দ শুনে উপরে গিয়ে তারা শিশুটিকে হাসপাতালে পাঠান। তার দাবি, খায়রুল ইসলামকে অন্য ফ্লোরে ওঠার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ইলিয়াস হোসেন বলেন, রাস্তা সরু হওয়ায় বিদ্যুতের খুঁটি ও ট্রান্সফরমার ভবনের পাশে বসানো হয়েছে। এটি বিদ্যুৎ বিভাগের নির্ধারিত স্থানেই স্থাপন করা হয়েছে। তাদেরও বলা হয়েছিল কাভার্ড তার ব্যবহার করা হবে।
গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর ছায়াবীথি জোনাল অফিসের এজিএম মোহাইমিনুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে তারা প্রাথমিকভাবে দেখেছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ম মেনেই দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ট্রান্সফরমার এমন দূরত্বে ছিল যেখানে শিশুর সরাসরি হাত পৌঁছানোর কথা নয়। কোনো বস্তু ব্যবহার করে স্পর্শ করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তে জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, গাজীপুরে অনেক আবাসিক ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা ও নির্মাণবিধি যথাযথভাবে মানা হয় না। ফলে অনেক জায়গায় বাড়ির একেবারে পাশে বিদ্যুতের খুঁটি ও ট্রান্সফরমার স্থাপন করতে হচ্ছে, যা বাসিন্দাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
তাদের দাবি, ভবনের পাশে থাকা বৈদ্যুতিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।