পাবনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে গতকাল সোমবার হামের ৫০ রোগী ভর্তি ছিল। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এই হাসপাতালে হামের নতুন ১২ রোগী ভর্তি হয়েছে। শিশুদের টিকা দেওয়ার পরও এই জেলায় হাম থামেনি।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগ প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও পৌরসভায় হামের টিকা দেওয়া শুরু করে এ বছরের ৫ এপ্রিল। এর মধ্যে পাবনা সদর, পৌরসভা, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া উপজেলা ছিল। তারপর এই জেলার বাকি জনপদে টিকা দেওয়া শুরু হয় ২০ এপ্রিল; কিন্তু এখনো হামে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।
৩০ উপজেলার মধ্যে একটি ছিল শরীয়তপুর জেলার জাজিরা। জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত ১০–১২ দিনে কোনো রোগী ভর্তি হয়নি। ওই ৩০টির মধ্যে ৫ উপজেলায় খোঁজ নিয়ে প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, হামের সংক্রমণ থামেনি। এর মধ্যে বরগুনা সদর, মাদারীপুর সদর, নওগাঁর পোরশা, যশোর সদর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় নিয়মিতভাবে রোগী ভর্তি হচ্ছে।
গত ৫ এপ্রিল টিকা দেওয়া শুরু হয় বরগুনা সদর, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, চাঁদপুর সদর ও হাইমচর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, ঢাকার নবাবগঞ্জ, গাজীপুর সদর, যশোর সদর, ঝালকাঠির নলছিটি, মাদারীপুর সদর, মুন্সিগঞ্জ সদর, লৌহজং ও শ্রীনগর, ময়মনসিংহ সদর, ত্রিশাল ও ফুলপুর, নাটোর সদর, নেত্রকোনার আটপাড়া, নওগাঁর পোরশা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট, পাবনা সদর, ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া, রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায়।
এরপর ৮ এপ্রিল থেকে টিকা দেওয়া শুরু হয় ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায়। ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকা দেওয়া শুরু হয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার। তবে টিকা দেওয়া হয়েছে ১০০ শতাংশের বেশি। পাঁচ বছরের বেশি বয়সী কিছু শিশু টিকা পেয়েছে বলে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের টিকা নেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে টিকা গ্রহণকারীর শরীরে হামের প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে।
৩০ উপজেলার শিশুরা টিকা পেতে শুরু করেছে আট সপ্তাহ আগে থেকে। এসব শিশুর শরীরে হামের প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে উঠছে কি না, তা কেউ পরীক্ষা করে দেখছেন না। দেখা বা জানার কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ বলেন, টিকা গ্রহণকারীদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (অ্যান্টিবডি) তৈরি হচ্ছে কি না, তা দেখা হচ্ছে না। এখনো কেন মানুষ হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, হামের সংক্রমণ কমে এসেছে। আগামী ২০–২৫ দিনে আরও কমে আসবে। হাম একেবারে নিয়ন্ত্রণে কবে আসবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা কেউ বলতে পারবেন না।
প্রায় দুই মাস আগে ৫ এপ্রিল হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়েছিল। অনেকেরই আশা ছিল টিকা দেওয়া শুরু হলে হাম কমবে, নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সংক্রমণ কিছুটা কমেছে। কিন্তু হামের সংক্রমণ ও হামের ভয় এখনো সারা দেশে রয়ে গেছে।
বরগুনা সদর হাসপাতালে সর্বশেষ ৮ দিনে ৪০ শিশু হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এই জেলায় ৬২ জন নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ৬৫৯ জনের। মারা গেছে দুজন।
বরগুনা জেলার সিভিল সার্জন মো. আবুল ফাত্তাহ প্রথম আলোকে বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছে। ২৪ ঘণ্টায় পাঁচজন এসেছে। দুজন ছুটি নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘হার্ড ইমিউনিটি’ (গণ–রোগ প্রতিরোধশক্তি) হতে সময় লাগবে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মাদারীপুর জেনারেল হাসপাতালে ৪২ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে। ২৮ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত ৬৩ জন এসেছে। এই জেলায় হামে একটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
নওগাঁর পোরশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গতকাল ১০ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল। এই উপজেলায় এ পর্যন্ত ৮০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে তিনজন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলা সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজন রোগী ভর্তি হয়েছে। গতকাল রোগী ভর্তি ছিল ২২ জন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন এ কে এম শাহাব উদ্দিন বলেন, জেলায় হামের সংক্রমণ কমলেও থামেনি। গত ১০ দিনে ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল ২৭৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে।
জেনারেল হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মাহফুজ রায়হান বলেন, এখন দুই মাস থেকে এক বছর বয়সী শিশুরাই বেশি ভর্তি হচ্ছে।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ১৩৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে; উপসর্গ নিয়ে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ৪৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত সারা দেশে ৭২ হাজার ৭০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৯৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
গতকাল পর্যন্ত হামে এ বছর ৫৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৯৮ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ এবং সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজির বলেন, ইতিমধ্যে হামের সমস্যা দীর্ঘায়িত হয়েছে। যে উদ্দেশ্যে জাতীয় টিকা ক্যাম্পেইন করা হলো, তার সফলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সবখানে ৯৫ শতাংশ কাভারেজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। টিকার কাভারেজ ৯৫ শতাংশ না হলে হার্ড ইমিউনিটি হবে না। তাতে সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হবে।