ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ১০ মে ২০২৬ ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩
সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কী, কেন এখন এটি এতটা তীব্র হলো
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Sunday, 10 May, 2026, 10:49 AM

সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কী, কেন এখন এটি এতটা তীব্র হলো

সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কী, কেন এখন এটি এতটা তীব্র হলো

সৌদি আরব একসময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-নাহিয়ান পরিবারের এক যুবরাজকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। একটি মরূদ্যানের নিয়ন্ত্রণ পেতেই তারা এই কাজ করেছিল। সেখানে প্রচুর তেলের মজুত আছে বলে ধারণা করা হতো। তবে ওই শেখ নিজের পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি হননি। এরপর সৌদি আরব সেখানে সামরিক অভিযান চালালেও তা ব্যর্থ হয়।

১৯৫০-এর দশকে সৌদি রাজপরিবার, ওমান ও চুক্তিবদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর (বর্তমান সংযুক্ত আরব আমিরাত) মধ্যে ঐতিহাসিক ‘বুরাইমি বিরোধ’ প্রয়াত সাংবাদিক ডেভিড হোল্ডেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফেয়ারওয়েল টু অ্যারাবিয়া’–তে (১৯৬৬ সালে প্রকাশিত) সংক্ষেপে এভাবেই তুলে ধরেন।

হোল্ডেনের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদিরা যাঁকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, তিনি হলেন জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান। তখন তাঁকে ‘বুরাইমির লর্ড’ বলা হতো। ইতিহাসে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তাঁর ছেলে ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ এখন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে এক তিক্ত বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন।

ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইয়েমেনে আমিরাত–সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর ওপর হামলা চালায় সৌদি আরব। ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে আমিরাতের প্রভাব ঠেকানোর লড়াইয়ে রিয়াদ এমনকি ওমানকেও পাশে নিয়েছে।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিক থেরোস মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘মতাদর্শ, পরিবার আর ইতিহাস—এই তিনটিকে যদি আপনি একসূত্রে দেখেন, তাহলে আপনি সৌদি-আমিরাত দ্বন্দ্বের কারণ বুঝতে পারবেন। থেরোস যখন প্রথম মধ্যপ্রাচ্যে আসেন, তখনো বুরাইমি বিরোধের উত্তেজনা বেশ টাটকা ছিল।’

বর্তমানে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত প্রায় সব ক্ষেত্রেই একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। লিবিয়ার মরুভূমি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার—সবখানেই চলছে তাদের রেষারেষি।

কূটনীতিক ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশ দুটির এই বিরোধই মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব যখন প্রশ্নের মুখে, তখন এই দ্বন্দ্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই মতভেদ এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের পকেটেও প্রভাব ফেলবে। চলতি মাসে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেলের জোট ‘ওপেক’ ছেড়েছে আরব আমিরাত। আবুধাবি জানিয়েছে, তারা এখন প্রতিদিন অতিরিক্ত লাখ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করবে। এর ফলে ভবিষ্যতে তেলের দাম নির্ধারণ ঘিরে সৌদির সঙ্গে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।

ওপেক থেকে আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়া মূলত দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটলেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সাদামাটাভাবে দেখলে মনে হবে, তেলের উৎপাদন নিয়ে মতভেদের কারণে ৬০ বছর পর ওপেক ছেড়েছে আবুধাবি। বিশ্লেষকদের মতে, আরব আমিরাত চায় দ্রুত বেশি তেল তুলে এখনই মুনাফা করতে। অন্যদিকে সৌদি আরব চায় তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দীর্ঘ মেয়াদে দাম ধরে রাখতে।

তবে এই নীতিগত পার্থক্যের আড়ালে অন্য একটি বড় ক্ষত রয়েছে।

ওপেক মূলত তেলসমৃদ্ধ মুসলিম দেশগুলোর একটি জোট, যা সৌদি আরবের নেতৃত্বে জ্বালানিনীতির সমন্বয় করে। আমিরাতের তুলনায় সৌদির তেলের মজুত দ্বিগুণেরও বেশি। এ ছাড়া ইসলামের দুই পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনা সৌদি আরবে অবস্থিত। সাড়ে তিন কোটি মানুষের দেশ সৌদির বিপরীতে আমিরাতের জনসংখ্যা মাত্র এক কোটি। এর মধ্যে স্থানীয় আমিরাতি নাগরিক মাত্র ১০ লাখ।

লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রব জিস্ট পিনফোল্ড বলেন, সৌদি আরব ওপেক ও উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা জাহির করতে চায়। বড় আয়তন আর সম্পদের কারণে তারা নিজেদের উপসাগরীয় অঞ্চলের স্বাভাবিক নেতা মনে করে।

পিনফোল্ড আরও বলেন, আরব আমিরাত আকারে ছোট হলেও তারা নিজেদের এক শক্তিশালী বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা মনে করে, সব সময় সৌদির কথা মেনে চললে বিশ্বমঞ্চে তাদের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব হবে।
সৌদি ও ইরানকে ঠেকানো

বর্তমান আরব আমিরাতের মূল ভিত্তি ছিল কিছু উপকূলীয় বাণিজ্যিক জনপদ। ঐতিহাসিকভাবে এই জনপদগুলো পূর্ব দিকে পারস্য (ইরান) এবং পশ্চিম দিকে নজদের গোত্রগুলোর চাপে পিষ্ট ছিল। নজদ হলো আরব উপদ্বীপের মধ্যাঞ্চল। সৌদি রাজপরিবার মূলত এই নজদ থেকেই উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ পুরোনো সেই আঞ্চলিক লড়াইকেই একবিংশ শতাব্দীতে ফিরিয়ে এনেছেন। তবে এবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেলের বিপুল অর্থ আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত থেরোস মিডল ইস্ট আইকে বলেন, আমিরাতিরা সৌদি আরবকে সব সময় ‘লোভী প্রতিবেশী’ হিসেবে দেখে। তারা মনে করে, রিয়াদ তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়।

থেরোস আরও বলেন, ঐতিহাসিকভাবেই উপসাগরীয় অঞ্চলে পারসিকদের প্রভাব বিস্তার নিয়ে আমিরাত উদ্বিগ্ন ছিল। তবে মোহাম্মদ বিন জায়েদ এখন বিশ্বাস করেন, ছোট দেশ হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব ও ইরানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিচ্ছে আরব আমিরাত। ইরান যখন আমিরাতে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, তখন ইসরায়েল তাদের রক্ষায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে।

একইভাবে আমিরাত জরুরি ভিত্তিতে মার্কিন ডলার সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।

আয়তনে ছোট হলেও আমিরাত পশ্চিমের বিভিন্ন কৌশলগত দেশে স্থানীয় অংশীদার খুঁজে নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। এতে সৌদি আরব বেশ বিরক্ত। রিয়াদ চায় না কোনো প্রতিবেশী দেশ তাদের সীমানার বাইরে গিয়ে এভাবে প্রভাব খাটাক।


সুদানের গৃহযুদ্ধে এই দুই প্রতিবেশী দেশ বিপরীত পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে। দেশ দুটির সম্পর্কের কতটা অবনতি হয়েছে, তা প্রথম জানায় মিডল ইস্ট আই। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্যারামিলিটারি বাহিনী আরএসএফ-কে সমর্থন দেওয়ায় আমিরাতকে শাস্তি দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তদবির করেছে সৌদি আরব।

ইরান যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে ইয়েমেনে আমিরাত–সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর ওপর হামলা চালায় সৌদি আরব। ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে আমিরাতের প্রভাব ঠেকানোর লড়াইয়ে রিয়াদ এমনকি ওমানকেও পাশে নিয়েছে।

এসব যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হতে পারলে আমিরাত তাদের প্রয়োজনীয় কৌশলগত শক্তি অর্জন করবে। সুদানে আরএসএফ সফল হলে লোহিত সাগর উপকূলে আমিরাতের এক নতুন মিত্র তৈরি হবে। এই মিত্রশক্তির অবস্থান হবে ঠিক সৌদি আরবের উল্টো দিকে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যখন প্রভাবশালী হয়ে উঠছিলেন, তখন দুই দেশের মধ্যে নিবিড় কাজের সম্পর্ক ছিল। মূলত মোহাম্মদ বিন জায়েদই তাঁকে কাতারকে বয়কট করতে রাজি করিয়েছিলেন।

—নেইল কুইলিয়াম, আরব উপসাগরীয় অঞ্চল বিশেষজ্ঞ, চ্যাথাম হাউস

পাশাপাশি ইয়েমেনের সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলও (এসটিসি) একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে চায়। বাব আল-মানদেব প্রণালির আরব উপসাগরীয় প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো নিয়ে তারা এই রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করছে।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় সৌদি আরবের কাছে এখন লোহিত সাগরের গুরুত্ব কতটা, তা বোঝা যাচ্ছে। রিয়াদকে এখন ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করতে লোহিত সাগরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এদিকে আরব আমিরাত সোমালিল্যান্ডের বিচ্ছিন্নতাবাদী সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। ইসরায়েলও এই সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তবে এসব দ্বন্দ্বের পেছনে আরও গভীর কারণ আছে।
প্রতিপক্ষের প্রতি অতিমাত্রায় একরোখা ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

২০১১ সালের আরব বসন্তের পর ইয়েমেন, লিবিয়া ও সুদান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এসব দেশে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব পাশে দাঁড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের সেনাবাহিনী ও প্রতিষ্ঠিত সরকারের। আমিরাতের দাবি, ইয়েমেন ও সুদানের বর্তমান সরকারগুলোয় ‘ইসলামপন্থীরা’ জেঁকে বসেছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক হিশাম আলঘাননাম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, সৌদি আরবের অবস্থান হলো একটি জাতিরাষ্ট্রকে সমর্থন দেওয়া, দেশটির ঐক্য ধরে রাখা, তাদের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা। তারা কোনো দেশকে টুকরা করার চেয়ে পুনর্গঠনেই বেশি বিশ্বাসী।

হিশাম আলঘাননাম আরও বলেন, অন্যদিকে আরব আমিরাত শুধু তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বা ইসলামপন্থীদের দমনেই অতিমাত্রায় জোর দিচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হচ্ছে। পাশাপাশি সশস্ত্র আধা সামরিক বাহিনীগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে বৈধ কর্তৃপক্ষ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

সৌদি আরবের এই গবেষক বলেন, ‘আমরা চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ দমনের পক্ষে। তবে সেটি হতে হবে আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকে কাজ করা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কোনো অ–রাষ্ট্রীয় পক্ষকে অস্ত্র দিয়ে বা অভ্যন্তরীণ বিভেদ সৃষ্টি করে তা করা ঠিক নয়।’

আরব বসন্ত–পরবর্তী সংঘাতগুলো মোকাবিলায় একসময় সৌদি আরব ও আমিরাত এক হয়ে কাজ করত। তখন দুই দেশই মনে করত, এতে তাদের উভয়ের স্বার্থরক্ষা হবে। ২০১২ সালে মিসরের নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের জয় দুই দেশের রাজপরিবারকেই বড় ধাক্কা দিয়েছিল।

একইভাবে ইয়েমেনে হুতিদের উত্থানকেও দুই দেশ হুমকি হিসেবে দেখেছিল। এই হুতিরা শিয়া ইসলামের একটি শাখা ‘জাইদিয়া’ মতাবলম্বী। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব একযোগে কাতারকে অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা কার্যকর করেছিল। তারা মনে করেছিল, কাতার এমন সব রাজনৈতিক আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব বিষয়ে দেশ দুটির মধ্যে ঐক্যের একটি বিশেষ কারণ ছিল। ২০১৫ সালে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যখন ক্ষমতায় আসছিলেন, তখন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ বয়সে তাঁর ছোট যুবরাজকে আগলে রেখেছিলেন।

চ্যাথাম হাউসের উপসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নেইল কুইলিয়াম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যখন প্রভাবশালী হয়ে উঠছিলেন, তখন দুই দেশের মধ্যে নিবিড় কাজের সম্পর্ক ছিল। মূলত মোহাম্মদ বিন জায়েদই তাঁকে কাতারকে বয়কট করতে রাজি করিয়েছিলেন।’

তবে কুইলিয়াম মনে করেন, সেই সখ্য ছিল স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম। প্রকৃতপক্ষে আরব বসন্ত শুরুর আগেই ২০০৯ সালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি একীভূত করার একটি প্রকল্প নিয়ে দেশ দুটির বিরোধ শুরু হয়।

২০০৯ সালে আরব আমিরাত উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থার (জিসিসি) মুদ্রা ইউনিয়ন প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য একক মুদ্রা চালুর পরিকল্পনা বড় ধাক্কা খায়। ওই প্রকল্পের সদর দপ্তর আবুধাবির বদলে রিয়াদে করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তে বেশ ক্ষুব্ধ ছিল আরব আমিরাত।

বেকার ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিকসেন এই পরিস্থিতির একটি তুলনা দিয়েছেন। তিনি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, এটি ছিল অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে বিবাদের মতো। সেই বিবাদের জেরে কোনো এক দেশ জোট থেকে বেরিয়ে গেলে যেমন হতো, এই ঘটনাও ছিল তেমনই।

উলরিকসেন বলেন, আরব বসন্তের আগে মনে হয়েছিল কাতার নয়; বরং আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যেই বিচ্ছেদ ঘটবে। আরব বসন্তের কারণে দেশ দুটি সাময়িকভাবে কাছাকাছি এসেছিল। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ২০১০ সালের আগে এবং ২০২০ সালের পর থেকে তারা মূলত একে অপরের ঘোরবিরোধী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিরোধের কারণ বুঝতে হলে একটি বিষয় তলিয়ে দেখা দরকার। নিজেদের দেশে এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বে ভিন্নমত বা মতপার্থক্যকে এই দুই দেশ কীভাবে দেখে, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল ব্যাখ্যা।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার বিবাদের পর সৌদি আরব বেশ দ্রুতই কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগিয়েছে। যদিও ২০২১ সালের আল-উলা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল আরব আমিরাতও। এই চুক্তির মাধ্যমেই কাতারের ওপর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। তবে দোহার সঙ্গে আবুধাবির সম্পর্ক এখনো শীতল রয়ে গেছে। তারা এখনো কাতারকে সন্দেহের চোখেই দেখে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র

সম্ভবত এই পার্থক্যের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ পাওয়া সম্ভব ইসরায়েলের প্রতি সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে। এর মাধ্যমে দেশটি দুই দশকের পুরোনো একটি শান্তি পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। সৌদি আরব এই পরিকল্পনা তৈরি করেছিল এবং একসময় আরব লিগও তা অনুমোদন করেছিল।

২০০২ সালের ওই প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না, যতক্ষণ না ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা হয়।

বাইডেন প্রশাসনের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল সৌদি আরব। তবে গাজায় ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ সেই চুক্তির সব সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিয়েছে।

    ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর ইয়েমেন, লিবিয়া ও সুদান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। এসব দেশে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব পাশে দাঁড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের সেনাবাহিনী ও প্রতিষ্ঠিত সরকারের। আমিরাতের দাবি, ইয়েমেন ও সুদানের বর্তমান সরকারগুলোয় ‘ইসলামপন্থীরা’ জেঁকে বসেছে।

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলাকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সেখানে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজার ৬০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান কার্যত জনগণের চাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়েছেন। ২০২৩ সালের শেষের দিকে ‘দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসি’ একটি জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, ৯৬ শতাংশ সৌদি নাগরিক মনে করেন, সব দেশের উচিত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক নেইল কুইলিয়াম মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘সৌদি আরবের রাজনীতি আবার তার ঐকমত্যের পুরোনো মডেলে ফিরে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরব আমিরাতে ইসরায়েল ইস্যুতে নানা ধরনের মত রয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ মনে করেন, এসব নিয়ে তাঁর ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই।’

কুইলিয়াম আরও বলেন, ‘মোহাম্মদ বিন জায়েদের কিছু হঠকারী অবস্থানকে এখন দায় মনে করছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। এর পাশাপাশি সাধারণ আরব জনগণের মনোভাবও তিনি এখন আগের চেয়ে ভালো বোঝেন।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যকার এই বিভেদকে আরও উসকে দিয়েছে। এর ফলে দুই দেশের দূরত্ব আরও বাড়ছে।

দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তবে তারা ওয়াশিংটনের অন্য মিত্রদের নিয়ে এখন পাল্টাপাল্টি জোট গড়ছে। আরব আমিরাত এখন ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করছে। অন্যদিকে তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি আলাদা বলয় বা জোট তৈরি করছে সৌদি আরব।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত থেরোস বলেন, ‘আরব আমিরাত বা সৌদি আরব—কারও পক্ষেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গ ছাড়া সম্ভব নয়। তবে তাদের এই নতুন জোটগুলোর পরিধি ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।’

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status