ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ৭ মাঘ ১৪৩২
ফেসবুকে এক পোস্ট শেয়ারের পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বন্দী!
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Saturday, 10 January, 2026, 12:17 PM

ফেসবুকে এক পোস্ট শেয়ারের পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বন্দী!

ফেসবুকে এক পোস্ট শেয়ারের পর অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বন্দী!

ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ারের কারণে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ১৪ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দক্ষিণ টিয়াখালী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত জাহান সোনিয়াকে। চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় ৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন করতে হয়েছে সংগ্রাম।

নুসরাতের সেই পেটের শিশুর বয়স এখন সাত বছর পেরিয়েছে। পেটে থাকার সময় মায়ের সঙ্গে কী ঘটেছে, এখন তা সে বুঝতে শুরু করছে। সে মায়ের কাছে জানতে চায়—তাকে পেটের ভেতর রেখে কেন মাকে জেল খাটতে হয়েছিল?

ফেসবুকে একটি শেয়ারে কষ্টের শুরু
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছিল। সে সময় ৩ আগস্ট ফেসবুকে অন্যের একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন নুসরাত। এ কারণে ৪ আগস্ট মধ্যরাতে তাঁকে আটক করে কলাপাড়া থানায় নেওয়া হয়। পরদিন ৫ আগস্ট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ (২) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। আর ৬ আগস্ট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহীদুল ইসলামের সই করা চিঠির মাধ্যমে তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন পর নুসরাত মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার উম্মে সাহারা লাইজুর সই করা চিঠির মাধ্যমে তাঁর সাময়িক বরখাস্তের আদেশটি প্রত্যাহার করা হয়। এ চিঠিতে সাময়িক বরখাস্তের সময় চাকরিকাল হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই সময়ের বেতনভাতা বকেয়া হিসেবে পাবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নুসরাত কাজে যোগ দিয়েছেন ২৯ ডিসেম্বর। বর্তমানে বেতনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল করাসহ অন্যান্য কাজ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর এবং তাঁর স্বামী আনোয়ার হোসেনের দুটি মুঠোফোন ও একটি ল্যাপটপ জব্দ করেছিল পুলিশ। এই মালামাল ফেরত পাওয়ার জন্যও আবেদন করতে হবে নুসরাতকে।

অমানবিক অভিজ্ঞতা
নুসরাতের বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, ফেসবুক পোস্টে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয়পত্র রাখা, পুলিশের ওপর নজর রাখা, আত্মরক্ষার জন্য ব্যাগে মরিচের গুঁড়া বা ছোট ইটের টুকরা রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি।

নুসরাত জাহান ৫ জানুয়ারি মুঠোফোনে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আবেগ থেকেই আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের করণীয় বা পরামর্শমূলক অন্যের একটি লেখা শেয়ার দিয়েছিলাম। এই অপরাধে পেটে সাত মাসের সন্তান নিয়ে থানায় আমাকে ১২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল। কারও সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। হাত-পা ফুলে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, আমি ভয়ংকর কোনো অপরাধী।’

নুসরাতের স্বামী আনোয়ার হোসেন ব্যবসায়ী, ওষুধের ফার্মেসি আছে। নুসরাতকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন বড় ছেলের বয়স ছিল ৬ বছর। এখন তার বয়স ১৩ বছরের একটু বেশি।

দীর্ঘদিনের সংগ্রামের গল্প বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে যাচ্ছিলেন নুসরাত। তিনি বলেন, কলাপাড়া থেকে পটুয়াখালী জেল প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। সেখানেই তাঁকে নেওয়া হচ্ছিল। বাবার ও স্বামীর অনুরোধে অনুমতি নিয়ে একটি মাইক্রোবাসের ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের ঠিক করা মাইক্রোবাসে সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তবে ভিড়ের কারণে বসার জায়গা ছিল সংকীর্ণ, আর পুরো পথজুড়ে পুলিশ সদস্যরা হাসি-তামাশা করতে করতে গিয়েছিলেন।

পটুয়াখালী নুসরাতের পরিচিত শহর। জানালার পাশে বসে তিনি লক্ষ করেন, মাইক্রোবাসটি জেলখানার দিকে না গিয়ে অন্য পথে যাচ্ছে। জানতে চাইলে পুলিশ জানায়, কারও সঙ্গে দেখা করতে হবে। গাড়ি থামে পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ের সামনে। তখনকার এসপি এসে বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করে জানতে চান, তিনি তাদের সদস্য কি না।

নুসরাত জানান, এসব নাম তিনি কখনো শোনেননি। তবু এসপি তাঁর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করেন এবং কেন তিনি সরকারের বিরুদ্ধে লেখা শেয়ার করেছেন, তা জানতে চান।

নুসরাত বলেন, ‘আরেক গাড়িতে বাবা আর স্বামী জেলখানার গেটে অপেক্ষা করছিলেন, কিন্তু আমার খোঁজ পাচ্ছিলেন না। পরে আমি পৌঁছালে পুলিশ সদস্যরা বাবাকে বলেন, আমি নাকি সারা পথ বেশ আরামে এসেছি, তাই তাঁদের মল্লিকা হোটেলে খাওয়াতে হবে। বাধ্য হয়ে বাবা তাঁদের খাওয়াতে নিয়ে যান। ভাবতে পারেন, কতটা অমানবিক হলে পুলিশ এমন আচরণ করতে পারে!’

কারাগারে শারীরিক যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা না থাকলেও মানসিক যন্ত্রণা ও সামাজিকভাবে হেয় হয়েছেন নুসরাত। এ কারণে তিনি প্রায় দুই বছর ঘরে নিজেক আটকে রেখেছিলেন। বাইরে বের হলেই মানুষ প্রশ্ন করত—‘কেন ফেসবুকে এমন পোস্ট দিলা, তলে তলে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ করছিলা’; ‘কারাগারে ব্যাপক মারধর করছে মনে হয়।’

নুসরাত বলেন, ‘কারাগারে মেঝেতে পাতলা কম্বল পেতে আরেকটি কম্বল মাথায় দিয়ে ঘুমাতে হতো। বড় পেট নিয়ে শোয়া থেকে একা উঠতে পারতাম না। সকালে লাল আটার রুটি ও গুড় দিত। দুপুরে যে খাবার দিত, সেটাই রাতেও খেতে হতো। প্রচণ্ড গরমে খাবার নষ্ট হয়ে যেত, তাই সন্ধ্যার খাবার আমি খেতে পারতাম না।’

নুসরাত জানান, সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, ভুয়া কাগজ দেখিয়ে জামিন চাওয়া হয়েছে। জামিন পাওয়ার পর ঢাকায় গিয়ে হাজিরা দিতে হতো। সে সময় ঢাকায় গিয়ে ফুফাতো ভাই গণমাধ্যমকর্মী জ ই মামুনের বাসায় উঠতেন। তবে ভাই দেশের বাইরে থাকলে দুই ছেলে ও স্বামীসহ হোটেলে উঠতে হতো।

জেল থেকে বের হওয়ার পর ২৩ নভেম্বর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নুসরাতের ছেলের জন্ম হয়েছে। তিনি বলেছেন, ছেলে সুস্থ আছে।

নুসরাত বলেন, ‘অপরাধীর মতো জীবন কাটাতে হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়া এবং সরকার পরিবর্তন না হলে হয়তো এটা সম্ভব হতো না। মা–বাবাও এ নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু স্বামী এক দিনের জন্যও কিছু বলেননি। স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য তিনি চেষ্টা করে গেছেন।’

প্রতারকের খপ্পর
নুসরাতের সংগ্রাম নিয়ে তাঁর ফুফাতো ভাই জ ই মামুন ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। ওই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেছেন, মাথায় মামলার বোঝা, গর্ভাবস্থায় জেলখানার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, দুই শিশুসন্তান নিয়ে কিছুদিন পর পর আদালতে হাজিরা দেওয়া, চাকরি থেকে বরখাস্ত, বেকারত্ব—সবকিছু মিলিয়ে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ‍্যে পড়েছেন নুসরাত।

ওই পোস্টে জ ই মামুন আরও উল্লেখ করেছেন, নুসরাত কারাগারে থাকার সময় এক রাতে তাঁর বাবার কাছে ফোন আসে। বরিশাল শের–ই–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, নুসরাত অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এ কারণে তিনি বিকাশে আড়াই বা তিন লাখ টাকা পাঠাতে বলেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। সে যাত্রায় প্রতারকের হাত থেকে রেহাই পান নুসরাতের বাবা।

আইনি লড়াই
মামলার শুরু থেকে বাবা, মা, স্বামীসহ পরিবারের সবাই নুসরাতের পাশে ছিলেন। বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইনজীবীরা।

নুসরাতের বিরুদ্ধে ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে (সংশোধনী ২০১৩) (৫৭–এর ২ ধারা) কলাপাড়া চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা হয়। এই ধারায় মিথ্যা বা মানহানিকর তথ্য প্রকাশের জন্য ৭ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে। মামলাটি প্রথমে ঢাকা, পরে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়।

হাইকোর্ট এই মামলার কার্যক্রম বাতিল করে গত বছরের ২২ মে নুসরাতকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।

পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ২০১৯ সালে পুলিশ এই মামলার চার্জশিট দেওয়ার সময় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ কার্যকর হয়। নতুন আইনের কারণে আগের আইন প্রযোজ্য নয়। তদন্তকারী অফিসার প্রায় দুই মাস পরে অভিযোগপত্র দাখিল করলে আদালত এটিকে আইনের অপব্যবহার হিসেবে গণ্য করেন এবং সাইবার ট্রাইব্যুনালে পেন্ডিং মামলা সম্পূর্ণরূপে বাতিলের আদেশ দেন।

ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, অবশেষে নুসরাত ভিত্তিহীন মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। তাঁর সঙ্গে যেটা ঘটেছে, তা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে। সরকার পরিবর্তন না হলে হয়তো এত সহজে মুক্তি পেতেন না।

সারা হোসেন আরও বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র তো আছে। নুসরাতের এ ঘটনায় রাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ ধরনের বেআইনি ঘটনা কেন ঘটল, কারা জড়িত ছিলেন তাঁর তদন্ত করে দোষীদের ক্ষমা চাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

নুসরাত বলেন, ‘এই দীর্ঘ সময় বলতে গেলে অন্ধকারে কাটিয়েছি। আমার কোনো স্বাভাবিক জীবন ছিল না। এলাকার অনেকেই ভয়ে আমার সঙ্গে কথাও বলতে চাইতেন না। আমি যে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব তা ভাবতেও পারিনি।’

তথ্য সূত্র: প্রথম আলো

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status