|
হঠাৎ আগুন-হাতবোমা, জনমনে প্রশ্ন-আতঙ্ক!
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() হঠাৎ আগুন-হাতবোমা, জনমনে প্রশ্ন-আতঙ্ক! সোমবার দিনভর সহিংসতার মধ্যে দুপুরে পুরান ঢাকার আদালত এলাকার কাছে প্রকাশ্যে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করেন দুই ব্যক্তি। সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, অনেকটা সিনেমার কায়দায় গুলি চালানো হয়। পরে ওই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দ্রুতই ছড়িয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আগুন আর প্রকাশ্যে খুনের এসব ঘটনায় আতঙ্ক তৈরি হতে শুরু করেছে জনমনে। পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, ১৩ নভেম্বর ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মসূচির সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক থাকা না থাকা নিয়ে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তরফে এসব ঘটনায় নগরবাসকে আতঙ্কিত না হতে অনুরোধ করা হয়েছে। ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নগরবাসীর এ নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।” এখন পর্যন্ত পুলিশ হাতবোমা হামলায় জড়িত এবং বাসে অগ্নিকাণ্ড নাশকতা কি না কিংবা এগুলোর সঙ্গে কারা জড়িত তা চিহ্নিত করতে না পারার কথা জানিয়েছে। তবে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে রাজধানীর ঢাকার কাকরাইল গির্জা, সেন্ট জোসেফ স্কুলসহ কয়েকটি জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ছাত্রলীগের এক সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের জেলায় জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচির দিনে এসব ঘটনার পর ক্ষমতাচ্যুত দলটির পক্ষে ঢাকার রাজপথে ঘোষিত কর্মসূচি কঠোরভাবে দমন করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। জুলাই বিপ্লবীদের ‘ধৈর্যের পরীক্ষা না নেওয়ার’ আহ্বান জানিয়ে সোমবার এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “এটা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর নয়, এটা নতুন বাংলাদেশ।” জুলাই অভ্যুত্থান দমাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিচারের রায় ঘনিয়ে আসায় ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর বিক্ষোভের কর্মসূচি দিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ। দলটির বিরুদ্ধে আন্দোলনে ‘হামলা ও মানুষ হত্যার’ অভিযোগ আনা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকা দলটির কর্মসূচির মধ্যে মহানগরীর ভিন্ন ভিন্ন অংশে হাতবোমা বিস্ফোরণ ও গাড়িতে আগুনের ঘটনা এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এক তরফা নির্বাচনের আগের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে এক যুগ আগে ২০১৩ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে এভাবে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে মনে করিয়ে দিয়েছে। সেই ‘অগ্নিসন্ত্রাসের’ দিনগুলো আবার ফিরে এল কী না সেই প্রশ্নও করছেন কেউ কেউ। তিন দিন পর ১৩ নভেম্বরে আওয়ামী লীগ ঘোষিত ‘লকডাউন’ কর্মসূচির সঙ্গে এর যোগসূত্র কিংবা ওইদিন দিন কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও বলাবলি হচ্ছে। সড়কের পাশে রাখা গাড়িতে আগুনে শুরু সোমবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে রাজধানীর শাহজাদপুরে সড়কে রাখা ভিক্টর পরিবহনের একটি বাস এবং আধাঘণ্টা পর একই সড়কের মেরুল বাড্ডায় আকাশ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেওয়ার খবরে শুরু হয় দিন। রাতে ধানমন্ডির ল্যাবএইডের সামনে শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটির একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। আর বাসে আগুনের ঘণ্টা দুয়েক আগে ভোর পৌনে ৪টার দিকে মিরপুর গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে হাতবোমা ছুড়ে পালিয়ে যেতে দেখা যায় দুই ব্যক্তিকে। এরপর মোহাম্মদপুরে স্যার সৈয়দ রোডে খাদ্যপণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠান ‘প্রবর্তনা’র সামনে ও সীমানার ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে সকাল ৭টা ১০ মিনিটের দিকে। ![]() হঠাৎ আগুন-হাতবোমা, জনমনে প্রশ্ন-আতঙ্ক! এদিন রাজধানীর অন্তত সাতটি জায়গায় যেসব হাতবোমা হামলার খবর এসেছে তার মধ্যে ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কে রাপা প্লাজার কাছে মাইডাস সেন্টারের সামনে এবং এর কিছুটা অদূরে ৯/এ নম্বর সড়কে ইবনে সিনা হাসপাতালের সামনে সকাল ৭টার দিকে হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এরপর সন্ধ্যায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বেতার ভবনের সামনে কে বা কারা হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। অল্প কিছু সময় পর রাতে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকায় এবং খিলগাঁও ফ্লাইওভারের ওপরে হাতবোমা বিস্ফোরণের খবর জানিয়েছে পুলিশ। তবে এসব ঘটনায় কারও হতাহত না হওয়ার তথ্য দিয়ে ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “ঘটনাগুলো কারা ঘটিয়েছে তা শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।” এমন প্রেক্ষাপটে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৩৪ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে ডিএমপির বার্তায় জানানো হয়। এছাড়া ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ছাত্রলীগের এক কর্মীকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। পুলিশ বলছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। ১৩ নভেম্বরের ঘোষিত কর্মসূচির সঙ্গে এসব নাশকতার কোনো যোগসূত্র আছে কি না জানতে চাইলে ডিএমপির মুখপাত্র তালেবুর বলেন, “আমরা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে তাদের সঙ্গে এদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা আমরা খতিয়ে দেখছি।” এ নিয়ে পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা সব সময় প্রস্তুত আছি। ১৩ নভেম্বর ঘিরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রস্তুতি আছে পুলিশের।” আগুন ও হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পর ‘নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের কর্মসূচীর বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নিষিদ্ধ সংগঠন বা সন্ত্রাসী সংগঠনকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠা আন্দোলন জামায়াতকর্মীদের সঙ্গে সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে শফিকুল আলম বলেন, “বিএএল, তাদের সহযোগী এবং তাদের গণহত্যাকারী নেতারা মনে করছেন যেন আবারও ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ফিরে এসেছে। তারা কল্পনা করছে দিবালোকে এক ডজন মানুষ হত্যার পর হাজার হাজার গুণ্ডা নিয়ে মধ্য ঢাকার রাস্তায় দখল নেওয়ার দৃশ্য। “কিন্তু দুঃখিত, এটা এখন একটি নতুন বাংলাদেশ। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক বা সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর যে কোনো সমাবেশের প্রচেষ্টাই আইনের পূর্ণশক্তির মুখোমুখি হবে।” এদিকে রাজধানীতে সকালে হাতবোমা বিস্ফোরণের পর রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের তল্লাশি-টহলসহ বাড়তি তৎপরতা দেখা গেছে। তবে পুলিশ আতঙ্কিত না হতে বললেও একের পর এক এসব ঘটনা মানুষকে ভীত করছে। একটি ওষুধ কোম্পানির কর্মী মাসুদ পারভেজ বলেন, “শহরে ঝামেলা হচ্ছে শুনে বাসা থেকে স্ত্রী ফোন করে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলে। ও জানে আমাদের পথে-ঘাটে ঘুরতে হয়। মার্কেট থেকে ফেরার পথে মোহাম্মদপুরের বছিলায় মোটরসাইকেল থামিয়ে পুলিশ তল্লাশি করেছে। অনেক পুলিশ দেখলাম এখানে, মনে হচ্ছে দেশে একটা কিছু হচ্ছে।” ‘শহরে ঝামেলা হচ্ছে’ বলতে কী বুঝিয়েছেন তার স্ত্রী জানতে চাইলে মাসুদ বলেন, “ওই যে সারাদিন টিভিতে দেখাচ্ছে। আগুন দিছে, দৌড়ায় দৌড়ায় মানুষ মারতেছে। আবার গ্রামীণ ব্যাংকসহ আর কোথায় ককটেল ফুটেছে। ভয় লাগে না, বলেন?” রেন্ট এ কার এর গাড়িচালক জুয়েল সরদার বলছেন, “সকালে গ্যাঞ্জামের খবরে গাড়ি বাইর করি নাই। মালিকের গাড়ি চুক্তিতে চালাই। মালিক কয়ে দিছে গাড়ি পুড়লে তোর দায়। এহন গাড়ির দায় নিবে কিডা, এজন্যই বের হইনি।” রাত ১০টার দিকে গাবতলী এলাকার গাড়ি চালক আশরাফ আলী বলছেন, “ধানমণ্ডিতে না কি বাস পুড়াইছে রাইতে। মাজার রোডে বইসা আছি, মালিকে কইছে যাত্রী দেইখা আগে বাড়াইতে। তয় যাত্রীও তেমুন নাই।” শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবকদের ভয় শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে শঙ্কার কথা বলেছেন অভিভাবকদের কেউ কেউ। ঢাকার মোহাম্মদপুরের আসাদ অ্যাভেনিউতে এক সড়কেই পাঁচটি স্কুল। রোববার এ সড়কের সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফটকে ককটেল বিস্ফোরণের পর আতঙ্ক ছড়িয়েছে অনেকের মাঝে। এ স্কুলের এক পাশে এসএফএক্স গ্রিন হেরাল্ড স্কুল, আরেকপাশে সেন্ট পল স্কুল। আর সেন্ট জোসেফের উল্টোপাশে ওয়াইডব্লিউসিএ গার্লস স্কুল। এই স্কুল থেকে আধা কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি, সামারফিল্ড, টাইনিটটস, লন্ডন ইন্টারন্যাশনাল স্কুলসহ অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব স্কুলে শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। সোমবার সামারফিল্ড ও টাইনিটটস স্কুল কর্তৃপক্ষ এক বার্তায় অভিভাবকদের ‘জুম’ অ্যাপ ডাউনলোড করে রাখতে বলেছে। ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটি’তে ১১ থেকে ১৩ নভেম্বর অনলাইনে ক্লাস হবে বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের জানিয়ে দিয়েছে। সোমবার সকালে মোহাম্মদপুরে স্যার সৈয়দ রোডে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের পারিবারিক খাদ্যপণ্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘প্রবর্তনা’ লক্ষ্য করে হাতবোমা হামলা হয়। এ ঘটনাস্থল থেকেও এসব স্কুল খুবই কাছে। ওই হামলার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, মেয়েকে নিয়ে এক অভিভাবকের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময়ই সেখানে বিস্ফোরণটি হয়; ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। আতঙ্কিত অভিভাবক মেয়ের হাত ধরে দৌড়াতে থাকেন। সেন্ট পল স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক গোলাম সারোয়ার বলেন, “খুব চিন্তায় আছি। বাচ্চাদের সামনে একবার কোন অঘটন ঘটলে সেই আতঙ্ক সহজে কাটবে না। স্কুল খোলা আছে, তবে ১৩ নভেম্বর আমি বাচ্চা পাঠাব না।” এক নিরাপত্তা পরিপত্রে নিজেদের কর্মীদের সতর্ক করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। কোনো দলের নাম না নিয়ে পরিপত্রে সংস্থাটি বলেছে, একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আন্দোলন ও ‘ব্লকেড’ ঘোষণা করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নানা ধরনের অপপ্রচার। পরিপত্রে দিনভর হাতবোমা বিস্ফোরণ, বাসে আগুন ও প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার কথা তুলে ব্র্যাকের পরিচালক (অপারেশন্স) অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাকিব উদ্দিন আহমেদ এমন পরিস্থিতিতে কর্মীদের কিছু নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে “সম্ভাব্য সহিংস বা রাজনৈতিক সমাবেশস্থল এড়িয়ে চলা, অফিসের সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার ও অগ্নিনির্বাপনের প্রস্তুতি রাখা, পাবলিক প্লেস বা অফিসে রাজনৈতিক সংলাপ পরিহার করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক সমর্থনে মন্তব্য বা কটূক্তিমূলক পোস্ট করা থেকে বিরত থাকা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর (পুলিশ স্টেশন, ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ইত্যাদি) মোবাইলে সেভ রাখা।”
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
