ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ২৪ মে ২০২৪ ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
‘পুরোটাই মায়াজাল, আমরা সবাই রয়েছি মেট্রিক্সে’! বলার পরেই রহস্যমৃত্যু তরুণীর
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Sunday, 29 January, 2023, 6:45 PM
সর্বশেষ আপডেট: Sunday, 29 January, 2023, 7:18 PM

‘পুরোটাই মায়াজাল, আমরা সবাই রয়েছি মেট্রিক্সে’! বলার পরেই রহস্যমৃত্যু তরুণীর

‘পুরোটাই মায়াজাল, আমরা সবাই রয়েছি মেট্রিক্সে’! বলার পরেই রহস্যমৃত্যু তরুণীর

নব্বইয়ের দশকের শেষে ‘দ্য মেট্রিক্স’ নামের এক হলিউডি ছবিতে তোলপাড় হয়েছিল সিনেদুনিয়া। লানা এবং লিলি ওয়াচাউস্কি নামে দুই রূপান্তরিত বোনের সেই কল্পবিজ্ঞান ছবির চরিত্রেরা আটকা পড়েছে ‘সিম্যুলেটেড রিয়্যালিটি’র জগতে। তাদের আশপাশে যা ঘটছে, তার কোনও কিছুই বাস্তব নয়। বরং তা কম্পিউটার সৃষ্ট এক জগৎ, যা নিয়ন্ত্রণ করছে চরিত্রদের মস্তিষ্কের শক্তি। ছবিতে মানুষেরা আসলে ওই শক্তির উৎস, যা অসংখ্য বুদ্ধিমান মেশিনকে চালনা করার রসদ জোগায়। যাতে ওই মেশিনগুলি চরিত্রের আশপাশের এক বাস্তবের মতো জগৎ তৈরি করতে পারে।

ওয়াচাউস্কি বোনেদের ওই ছবির মতো তবে কি আমরাও কোনও ‘অবাস্তব’ জগতে রয়েছি? যাকে নিয়ন্ত্রণ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অসংখ্য মেশিন? মেশিনের হাতের পুতুল হিসাবেই কি নিত্যদিনের কাজকারবারে জড়াচ্ছি আমরা? ‘দ্য মেট্রিক্স’ ছবিমুক্তির দীর্ঘ দিন পরেও এ হেন নানা প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ।

কিয়ানু রিভস, লরেন্স ফিসবার্ন, ক্যারি-অ্যান মসের অনবদ্য উপস্থিতিতে জমিয়ে ব্যবসা করেছিল ‘দ্য মেট্রিক্স’। ১৯৯৯ সালে প্রথম ছবির পর এই সিরিজ়ের আরও ৩টি সিনেমা হয়েছিল। সবগুলিই হামলে পড়ে দেখেছে আমজনতা। তাদের অনেকের প্রশ্ন ছিল, এমনটা কি সম্ভব?

হলিউডি ছবিটির একটি দৃশ্যে মরফিয়াসের বিখ্যাত উক্তি ছিল, ‘‘বাস্তব কী? বাস্তবকে কী ভাবে ব্যাখ্যা করবে তুমি? যা কিছু অনুভব করছ, যার গন্ধ পাচ্ছ, যা স্বাদ নিচ্ছ এবং দেখতে পাচ্ছ, যদি তুমি এ সবের কথা বলো, তা হলে সোজা কথায় বাস্তব হল এমন কতগুলি বৈদ্যুতিক সিগন্যাল যা তোমার মস্তিষ্ক পড়ে ফেলেছে। এই জগৎকেই তুমি জানছ।’’ সত্যিই কি তাই? এ নিয়ে তর্কবিতর্ক অব্যাহত।

আমাদের আশপাশের জগৎ কি বাস্তব? না কি নিয়ো, মরফিয়াস অথবা ট্রিনিটিদের মতো আমরাও কোনও এক মেট্রিক্সে আটকে পড়েছি? ২০১৯ সালে সিলিকন ভ্যালির এক সংস্থার ৩৩ বছরের সিইও এরিন ভ্যালেন্টির রহস্যমৃত্যুর পর আবার এই প্রশ্নগুলি উঠছে।

সিলিকন ভ্যালিতে সফল উদ্যোগপতি হিসাবে স্বল্প সময়েই নাম কুড়িয়েছিলেন এরিন। ১৯৮৬ সালে নিউ ইয়র্কের অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম তাঁর। তবে ছোটবেলা থেকেই তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ মিলেছিল। হাসিখুশি, ছটফটে এবং নানা উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনা গিজগিজ করত এরিনের মনে।

স্কুলের পড়াশোনার পর আমেরিকার জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ়নেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ডিগ্রি হাসিল করেছিলেন এরিন। এর পর ‘সামিট পার্টনার্স’ নামে এক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট ফার্মে চাকরি। সেখানে শুরুর দিনগুলিতেই ২,০০০ কোটি ডলারের তহবিল সামলাতে হয়েছিল তাঁকে।

২০১১ সালে হবু জীবনসঙ্গী হ্যারিসন ওয়াইনস্টাইনের সঙ্গে আলাপ হয় এরিনের। যদিও অনেকের দাবি, ১৮ বছর বয়স থেকেই হ্যারিসনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল তাঁর। পেশায় মনোবিদ হ্যারিসনের সঙ্গে মিলে ইউটার সল্ট লেক সিটিতে থাকতে শুরু করেন এরিন। সেখানে নিজেদের সংস্থাও খোলেন।

উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এরিনের ব্যবসায়িক বুদ্ধির মিশেলে কিছু দিনের মধ্যেই লাভের মুখ দেখেছিল ‘টিঙ্কার ভেঞ্চার’ নামের ওই সংস্থাটি। মাত্র ৮ বছরের মধ্যেই ১২০ জনের দলকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিলেন এরিন। সংস্থার গ্রাহকের তালিকায় হোমড়াচোমড়াদেরও টেনে এনেছিলেন তিনি।

প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে বর্ষসেরা মহিলা হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এরিন। ‘উইমেন ইন টেক অ্যাওয়ার্ড’ নামের ওই সম্মানের পাশাপাশি আরও একটি পুরস্কার জুটে যায় তাঁর।

‘কন্ট্রোল-ল্যাবস’ নামে একটি স্টার্টআপে অংশীদারিত্বর পুরস্কার জিতেছিলেন এরিন। সম্প্রতি ওই স্টার্টআপটি কিনে নিয়েছে ফেসবুক। যার আর্থিক মূল্য নাকি ৫০ থেকে ১০০ কোটি ডলারের মধ্যে।

সিলিকন ভ্যালিতে বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছিল ‘কন্ট্রোল-ল্যাবস’। সংস্থার দাবি ছিল, তারা হাতে পড়ার এমন একটি ব্যান্ড তৈরি করার চেষ্টা করছে, যা দিয়ে মানুষের মন পড়ে ফেলা যাবে।

‘কন্ট্রোল-ল্যাবস’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের দিন এরিনের দাবি ছিল, অদূর ভবিষ্যতে কম্পিউটারের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ স্থাপনের স্বপ্নপূরণ করবে তাঁর সংস্থা। যার ফলে সকলেই ওই কম্পিউটারগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

এরিনের এই দাবির পর অনেকেরই প্রশ্ন ছিল, যদি এর উল্টোটা হয়? কম্পিউটারকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যদি সেই মেশিনগুলিই আমাদের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে? আশঙ্কা সত্ত্বেও ‘কন্ট্রোল-ল্যাবস’-এর গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এর পিছনে মূলত এরিনের হাত ছিল বলে দাবি।

সংস্থার উন্নতিতে নিজেকেও উন্নত করার চেষ্টা শুরু করেছিলেন এরিন। ২০১৯ সালে একটি কর্মশালায় যোগদানের জন্য নাম নথিভুক্ত করেছিলেন তিনি। তার জন্য নিজের শহর ছেড়ে তাঁকে অরেঞ্জ কাউন্টিতে যেতে হত। কে জানত, সেটিই তাঁর শেষযাত্রা হয়ে যাবে?

২০১৯ সালে অক্টোবরের প্রথম দিনে সল্টলেক সিটি থেকে অরেঞ্জ কাউন্টিতে পৌঁছেছিলেন এরিন। সেখানে ‘ক্রিয়েট দ্য পাওয়ারফুল’ নামে একটি সম্মেলনে যোগ দেন তিনি। ওই শহরে দু’দিন থাকার পর সিলিকন ভ্যালিতে তাঁর পুরনো কর্মীদের সঙ্গে দেখা করে বিমানে করে ঘরে ফেরার কথা ছিল।

এরিনের পরিবার জানায়, ৭ অক্টোবর ‘উইমেন ইন টেক অ্যাওয়ার্ড’-এর অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন তিনি। এর পর এক বন্ধুর সঙ্গে নৈশভোজ সেরে বাড়ি ফেরার কথা ছিল।

৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধুর সঙ্গে নৈশভোজের পর অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন এরিন। মা অ্যাগনেস ভ্যালেন্টিকে ফোন করে জানান, এ বার বিমানবন্দরের জন্য রওনা দেবেন। তবে ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে পার্কিংয়ে ঢুকে দেখেন, তাঁর গাড়িটি গায়েব।

ভাড়া করা গাড়িটি খুঁজে না পাওয়ায় কিছুটা বিচলিত হয়ে ওঠেন এরিন। তাঁর মা জানিয়েছিলেন, সে সময় এরিন বিড়বিড় করে কথা বলছিলেন। কয়েক মিনিট পরেই ওই গা়ড়িটি দেখতে পান তিনি। তবে এ বার আরও অদ্ভুত কাণ্ড।

পার্ক করার মিনিট দশেক আগেই গাড়িটিতে জ্বালানি ভরেছিলেন। তবে গাড়িটি চালু করতে গিয়ে দেখেন, তাতে একবিন্দুও জ্বালানি নেই। ফলে সম্ভবত তাঁর বিমানবন্দরে যাওয়া হবে না।

এরিনের কথাবার্তা কিছু একটা গন্ডগোল আঁচ করে তাঁর জামাইকে ফোন করেন অ্যাগনেস। এরিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার অনুরোধ জানান হ্যারিসনকে। পরের কয়েক ঘণ্টায় তাঁরা দু’জনেই এরিনে সঙ্গে ক্রমাগত ফোনে কথা বলেছিলেন।

অ্যাগনেস এবং হ্যারিসন জানিয়েছেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় গোটাটাই বেশ রাগত ছিলেন এরিন। সে সময় কোনও কিছু আতঙ্কও যেন চেপে বসেছিল তাঁর মনে। এক সময় খসখসে স্বরে এরিন বলেন, ‘‘সব কিছুই একটা খেলা। এটা আসলে আমাদের চিন্তাভাবনা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা। আমরা সকলেই মেট্রিক্সে রয়েছি।’’ সেটিই ছিল এরিনের শেষ উক্তি।

এর পর এরিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা যায়নি। পরের দিন ঘরে ফেরেননি তিনি। এমনকি, সে সময় থেকেই তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না বলে দাবি। চিন্তিত হয়ে পুলিশে খবর দেয় এরিনের পরিবার। এর ৫ দিন ধরে এরিনের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। অনলাইনে ওই ভাড়া করা গাড়িটির নম্বর প্রকাশ করে চলে প্রচারও। তবে সব চেষ্টাই বিফলে যায়।

১২ অক্টোবর এরিনের খোঁজ পাওয়া যায়। ফোনের লোকেশন খতিয়ে দেখে জানা যায়, শেষ বার যেখান থেকে ফোনে কথা বলছিলেন, তা থেকে মোটে ৪-৫টি ব্লক দূরে শহরতলির মাঝরাস্তায় তাঁর গাড়িটি দাঁড় করানো ছিল। গাড়ির পিছনের আসনে এরিনের দেহ পড়েছিল। কোনও ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। নেই কোনও অস্বাভাবিকতা। এমনকি, তিনি আত্মহত্যাও করেননি। তবে আচমকা কী ভাবে মৃত্যু হল এরিনের?

ময়নাতদন্তে এরিনের দেহে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি। আবার শহরতলির ব্যস্ত রাস্তায় গাড়িটি দাঁড় করানো থাকলেও সেটি কী ভাবে কারও নজরে এল না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এরিনের শেষ উক্তি নিয়েও ধাঁধা মেটেনি। যে জগতে তিনি রয়েছেন, বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই বলেই কি ওই হলিউডি ছবির মতোই এরিনকে ‘মিটিয়ে’ দেওয়া হয়েছে?

‘সিম্যুলে়টেড রিয়্যালিটি’ নিয়ে কম বিতর্ক নেই। যদিও বাস্তবে এর প্রয়োগও দেখা যায়। বিমানচালনা শিখতে গিয়ে হবু চালককে প্রথমেই আকাশে বিমান চালাতে হয় না। বরং ‘সিম্যুলে়টেড রিয়্যালিটি’র মাধ্যমে সেই পরিবেশ তৈরি করিয়ে মাটিতেই বিমানচালনার প্রশিক্ষণ পান তিনি। ২০১৩ সালে ‘সিমুলেশন হিপনোসিস’ করার প্রস্তাব করেছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিক বসট্রম। নাসার পদার্থবিদ টমাস ক্যাম্পবেলও মনে করেন, বাস্তবের মতো অনুভব করছি আমরা। তবে এটাই বাস্তব নয়। এ নিয়ে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের উক্তি মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। আইনস্টাইনের উক্তি ছিল, ‘‘বাস্তব নিছকই একটা বিভ্রম।’’

অনেকের যুক্তি, মনে করুন, জন্মের পর আমরা অর্থাৎ খেলোয়াড়েরা এক-একটি খেলায় ঢুকে পড়ি। প্রতিটি খেলোয়াড়ের ভূমিকা সে খেলায় ভিন্ন। মৃত্যুর পর আমাদের দেহ বিনষ্ট হলে ওই খেলায় অন্য খেলোয়াড় ঢুকে পড়়ে। তবে ওই মৃত খেলোয়াড়ের আত্মার মৃত্যু হয় না। সেটি যে কোনও খেলায় ঢুকতে পারে।

পূর্বজন্মের অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি করেন এমন অনেকের মতে, প্রতিটি খেলোয়াড়ের ইহজগতের যাবতীয় অভিজ্ঞতা সঞ্চিত রয়েছে দুনিয়ায়। ডলোরিস ক্যাননের মতো অনেকে যাকে ‘আকাশিক রেকর্ড’ নামে একটি সার্ভার হিসাবে মনে করেন। ‘হিপনোসিস’ বা সম্মোহনের মাধ্যমে ‘আকাশিক রেকর্ড’ থেকে পূর্বজন্মের নানা তথ্য আহরণ করা যায় বলে মনে করেন তাঁরা। তবে কি এটা সম্ভব যে আমরা সত্যিই ‘সিম্যুলেটেড’ জগতে বাস করছি?

� পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ �







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: [email protected]
কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status