দেশপ্রেম ইসলামের শিক্ষা। একজন মুসলিম সত্যিকার ও খাঁটি দেশপ্রেমিক হয়। দেশের সঙ্গে কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না মুসলিমরা। যে যেই দেশের নাগরিক, সে দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং দায়বদ্ধতা থাকা স্বভাবসিদ্ধ বিষয় এবং ইসলামেরও শিক্ষা।
রাসুল (সা.)-এর সিরাত থেকে জানতে পারি, যখন তিনি তার স্বদেশ ভূমি পবিত্র মক্কা নগরী ত্যাগ করে মদিনায় যাচ্ছিলেন, তখন মক্কার দিকে তাকিয়ে অশ্রুপাত করে বলেছিলেন, হে মক্কা, তুমি আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জায়গা, যদি তোমার অধিবাসীরা আমায় তোমাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য না করতো তাহলে আমি কখনই এই শহর ছেড়ে যেতাম না।
এই ঘটনা থেকে আমরা স্বদেশ প্রেমের শিক্ষা পাই। দেশকে ভালোবাসার এমন অসংখ্য নির্দেশনা হাদিসের কিতাবে রয়েছে। মক্কা ছেড়ে যখন রাসুল (সা.) মদিনা মুনাওয়ারা যান এবং মদিনাকে স্বদেশ বানিয়ে নেন, তখন একইভাবে মদিনা মুনাওয়ারাকে ভালোবাসেন। মদিনার প্রতিটি পাথর খণ্ডকেও ভালোবাসেন।
সহিহ বুখারীর হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুল (সা.) ওহুদ পাহাড় সম্পর্কে বলেন, ওহুদ এমন এক পাহাড় যাকে আমরা ভালোবাসি এবং ওহুদ পাহাড় আমাদেরকে ভালোবাসে। এই যে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাওয়া এটা ইমানের দাবি। কারণ যেই আলো বাতাস ও প্রকৃতিতে মানুষ বেড়ে ওঠে তা আল্লাহর নেয়ামত। আল্লাহর অনুগ্রহ ও আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া হিসেবেও ভালোবাসা উচিত নিজের দেশ ও অঞ্চলকে।
দেশের প্রতি ভালোবাসা অনেকটা পরিবারের প্রতি ভালোবাসার মতো। দেশের সব অধিবাসী একটি পরিবারের মতো হতে হয়। থাকতে হয় মিলে মিশে। বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের নাগরিক একটি দেশের অধিবাসী, একটি পরিবারের সদস্যের মতো হয়ে থাকাতেই রয়েছে স্বার্থকতা।
অবশ্য নিজের পরিবারের প্রতি ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে, আশপাশের অন্য সবার প্রতি শত্রুতা পোষণ করতে হবে। তবে যে নিজের পরিবারকে ভালোবাসতে পারে না সে অন্য কাউকেও ভালোবাসতে পারে না। নিজের পরিবারের প্রতি ভালোবাসার অর্থ নিজের পরিবারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। কারণ একজন ব্যক্তির জন্য তার পরিবার সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) দান সদকা করার ফজিলত বর্ণনার পর বলতেন, নিজের পরিবারের সদস্যদের ওপর আগে ব্যয় করো, তারপর অন্যদের দান করো। নিজের পরিবারকে বিপন্ন করে অন্য গরিব-দুঃখিদের দান করায় নেই কোনো মাহাত্ম। এটাই হাদিসের শিক্ষা।
একই কথা নিজের দেশ সম্পর্কেও প্রযোজ্য। স্বদেশকে ভালোবাসার অর্থ এই নয় যে, অন্য সব দেশের প্রতি বিদ্বেষ থাকবে। কিন্তু নিজের দেশকে সব সময় অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণের প্রয়োজন নেই। বিদ্বেষী মনোভাব ভালো কথা নয়। যখন অন্য দেশের প্রতি বিদ্বেষ রাখা ইসলামে যায়েজ নেই তখন নিজের দেশকে অবজ্ঞা করা কত বড় অপরাধ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা নিজের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে মদিনার মুনাফিকদের মতো। মুনাফিকরা স্বদেশকে অবজ্ঞা করে বহিঃশত্রুদের পক্ষ নিত। পবিত্র কুরআনে তাদের অনেক নিন্দা করা হয়েছে। পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজেই তাদের ভালো বলা হবে না।
দেশপ্রেমের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে পতাকার সম্মান রক্ষা করা। পতাকা একটি প্রতীক হলেও ইসলামে এর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক মুতার যুদ্ধে রাসুল (সা.) সেনাপতি বানিয়েছিলেন হযরত জাফর ইবন আবি তালিবকে। হযরত জাফর রা. শহীদ হয়ে গেলেন। তার হাত থেকে পতাকা পড়ে যাওয়ার পূর্বেই পতাকা তুলে নিলেন আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। ডান হাতে পতাকা ছিল। শত্রুরা ডান হাত কেটে দিল। তিনি বাম হাত দিয়ে পতাকা ধরলেন। বাম হাতও কেটে দেওয়া হলো। এবার দুই কাটা হাতের প্রকোষ্ঠ দিয়ে পতাকা ধরে রাখলেন। হাতের গোড়া থেকে হাত কেটে দেওয়া হলো। এবার তিনি দাঁত দিয়ে পতাকা কামড়ে ধরলেন। এবার ধড় থেকে শরীর পৃথক করে দেওয়া হলো। তার মুখ থেকে পতাকার দণ্ডটি নিচে পড়ার আগেই পরবর্তী সেনাপতি হযরত যায়েদ রা. পতাকা তুলে নিলেন। এই হলো ইসলামের শিক্ষা। ইসলামের দৃষ্টিতে পতাকাকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
সম্প্রতি ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হলো। একটি ম্যাচে স্টেডিয়ামের দর্শক গ্যালারিতে দেখা গেছে, দেশের কিছু বিকৃত মস্তিষ্ক লোক পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন করছে। এর মাধ্যমে তারা স্বদেশের প্রতি তাদের বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন। অন্য দেশের প্রতিও বিদ্বেষ প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই কিন্তু নিজের দেশের প্রতি যে কোনো অবস্থায় দায়বদ্ধ থাকা আবশ্যক। কেবল নিজের দেশ যখন অন্য কোনো দেশের ওপর জুলুম করবে তখন নিজের দেশের পক্ষে থাকা যাবে না, বরং ন্যায়ের পক্ষে থাকতে হবে। ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তান বাঙালিদের ওপর জুলুম করছিল তখন বর্তমান পাকিস্তানের কিছু বিবেকবান সাধারণ মানুষও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বাড়াবাড়িকে স্বাভাবিকভাবে দেখেনি। এর স্পর্শকাতরতা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। আমরা অন্য কোনো দিক নয়, কেবল এর ইসলামিক দৃষ্টিকোণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি। কুরআন সুন্নাহর আলোকেই যে কাজটি ভালো হয়নি সেটি আমাদের বুঝে নেওয়া আবশ্যক।
কেউ কেউ বলছেন, এটা ঘটেছে সম্প্রতি বাংলাদেশের ক্রিকেটের মান নিচে নেমে যাওয়ার কারণে। পাকিস্তান যেহেতু ভালো খেলছে তাই কেউ কেউ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন জ্ঞাপন করতে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছে। এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। কারণ কারও নিজের মায়ের চেহারা খারাপ হওয়ায় অন্য কোনো সুন্দরী নারীকে তো মা ডাকতে পারে না বা নিজের ছেলের যোগ্যতা না থাকায় তার কাছে অন্যের সন্তান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। বাংলাদেশের ক্রিকেট দল যত দুর্বল বা ত্রুটিপূর্ণ হোক, তারা তো আমাদের দেশের। অন্য দেশের ক্রিকেটাররা আমাদের কাছে কেন নিজের দেশের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়ে যাবে? এটা সাধারণ বিবেক বুদ্ধির খেলাফ যেমন ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকেও চরম নিন্দনীয়।
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) যখন কোনো সফর থেকে ফিরতেন, মদিনার পাহাড়গুলো দূর থেকে দেখেই উটনির গতি বাড়িয়ে দিতেন। উটনি না হয়ে ঘোড়া বা অন্য কোনো প্রাণীর পিঠে চড়ে থাকলে সেটিরও গতি বাড়িয়ে দিতেন। (বুখারী শরীফ) হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, এ হাদীসে দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি অনিরুদ্ধ টান শরিয়ত সিদ্ধ হওয়ার স্বপক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। বুখারী ও মুসলিম শরীফে আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) দেশপ্রেমের দোয়া করতেন। রাসুল (সা.) তার দোয়ায় বলতেন, হে আল্লাহ, তুমি মদিনাকে আমাদের নিকট প্রিয় করে দাও যেভাবে মক্কাকে আমাদের প্রিয় করে দিয়েছো।
প্রিয় নবী প্রথম যখন নবুওয়াত লাভ করেন এবং হযরত খাদিজা নবীজী সা. কে তার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফেলের নিকট নিয়ে যান। ওয়ারাকা রাসুল (সা.) কে বলেন, হে মুহাম্মাদ আপনাকে যখন আপনার স্বজাতি দেশছাড়া করবে তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম। রাসুল (সা.) বিস্ময় ও দুঃখের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, আমার স্বজাতি আমাকে আমার দেশ থেকে বের করে দেবে?
সিরাতে হালবিয়ার লেখক এ ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, রাসুল (সা.)-এর এই প্রশ্ন থেকে বোঝা যায় তিনি কত বেশি তার দেশকে ভালোবাসতেন। এমন অসংখ্য ঘটনা হাদিস ও সিরাতের কিতাবে রয়েছে। এসব ঘটনা থেকে আমরা দেশপ্রেমের শিক্ষা পাই। খেলাধুলা বলে আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের নতুন প্রজন্ম যদি এভাবে নিজের দেশের প্রতি বিদ্বেষ নিয়ে বেড়ে ওঠে তাহলে তারা তাদের দ্বীন ধর্মের প্রতিও একসময় আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে। কারণ একবার শেকড় কাটা শিখে গেলে ধীরে ধীরে সব মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে।