|
গত ২২ বছরে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত ২,৯৫৭; পুলিশের হাতে ৪৬%
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() গত ২২ বছরে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত ২,৯৫৭; পুলিশের হাতে ৪৬% এদিকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২২ বছরে দেশে 'কথিত বন্দুকযুদ্ধ' বা 'ক্রসফায়ারে' নিহত হয়েছেন প্রায় তিন হাজার মানুষ, যার মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ ৪৬ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে পুলিশের হাতে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর চকবাজারে 'কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম'-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি এই মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, 'কথায় কথায় পুলিশের ওপর দায় চাপানোও ঠিক নয়। "কে আসবে, আপা কবে আসবে, কী হবে", ওইটা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয় না। আমাদের দায়িত্ব হলো, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ারের যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব।' আইজিপির এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রকাশ্য আদালতে তার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পরিস্থিতিতেই সরকার কিংবা কোনো বাহিনীর বিচারবহির্ভূতভাবে কাউকে হত্যা করার আইনি সুযোগ নেই। ২২ বছরের পরিসংখ্যান: শীর্ষে পুলিশ, দ্বিতীয় র্যাব আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে 'ক্রসফায়ার' বা 'কথিত বন্দুকযুদ্ধে' প্রাণ হারিয়েছেন মোট ২ হাজার ৯৫৭ জন। পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১ হাজার ৩৭১ জন—অর্থাৎ প্রায় ৪৬ শতাংশই নিহত হয়েছেন পুলিশের অভিযানে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) হাতে। বিশেষ এই বাহিনীটি বর্তমানে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে পরিচিত। এছাড়া একই সময়ে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে 'কথিত বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হয়েছেন আরও ৬৯ জন। ২০২৪ সালের পর পুলিশ-র্যাবের তথ্য নেই, তবে আছে অন্যান্য বাহিনী আসকের বার্ষিক প্রতিবেদনের বছরভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর থেকে পুলিশ কিংবা র্যাবের হাতে 'ক্রসফায়ার' বা 'কথিত বন্দুকযুদ্ধে' কোনো ব্যক্তি নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়নি। তবে এ সময়ে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে 'কথিত বন্দুকযুদ্ধে' প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত ছিল। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অভিযানে একজন, ২০২৫ সালে কোস্টগার্ডের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে একজন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে একজন নিহত হয়েছেন। মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এসব ঘটনাকে 'বন্দুকযুদ্ধ' বলে চালিয়ে দেওয়া হলেও এর পেছনে মূলত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। 'ক্রসফায়ারের নামে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়': নূর খান লিটন আইজিপির বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) বলেন, 'পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সংবিধান ও আইনের সরাসরি লঙ্ঘন হতে পারে—এমন বক্তব্য আসা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ধরনের বেআইনি বক্তব্যের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।' নূর খান বলেন, 'বাংলাদেশে ক্রসফায়ার তো দুই পক্ষের গোলাগুলিতে হয় না, বরং মানুষকে ধরে নিয়ে হত্যা করে 'ক্রসফায়ার' বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, এটা সবাই জানে।' আইজিপির বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, 'পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন বক্তব্য এলে তা সরকারের জন্যও বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। একই সঙ্গে এমন বক্তব্য দেওয়ার পর আইজিপির নৈতিকভাবে ওই পদে বহাল থাকা উচিত কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন এই মানবাধিকারকর্মী।' 'অধিকাংশ ঘটনাই ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড': মনজিল মোরসেদ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, 'অতীতের কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, এগুলোর অধিকাংশই প্রকৃত কোনো বন্দুকযুদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।' তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হয়তো মোট ঘটনার ১০ শতাংশ প্রকৃত ক্রসফায়ার হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বাকি ৯০ শতাংশ ঘটনাই সাজানো এবং ক্রসফায়ার হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হয়েছে। অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, 'কাগজপত্রে ও গণমাধ্যমে এসব ঘটনাকে 'ক্রসফায়ার' বলা হলেও পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তালিকা ও তথ্য-উপাত্ত থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, বহু মানুষের জীবন এভাবেই বেআইনিভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।' তিনি জোর দিয়ে বলেন, 'একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাংবিধানিক আইন ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করলে কোনোভাবেই ক্রসফায়ারের সুযোগ থাকতে পারে না। কেউ অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার হবে। বিচারে দোষ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা অন্য যেকোনো দণ্ড হতে পারে। কিন্তু বিচারবহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাউকে হত্যা করার কোনো এখতিয়ার নেই।' আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, 'আইজিপি হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন সরকার অনুমতি দিলে তারা এমন ব্যবস্থা নেবেন। তবে আমার মনে হয় না কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তাকে এমন বিচারবহির্ভূত কাজের অনুমতি দেবে।' তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আইজিপির মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল পদে বসে প্রকাশ্যে এভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমতির কথা বলা কোনোভাবেই সমীচীন হয়নি। ব্যক্তিগতভাবেও কেউ যদি এমন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন, তবে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার চাইলে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তও বিবেচনা করতে পারে।' |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
