|
ব্রিকস কি পশ্চিমা আধিপত্যের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পেরেছে?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ব্রিকস কি পশ্চিমা আধিপত্যের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পেরেছে? শনিবার এসব দেশের নেতারা একই কক্ষে বসতে যাচ্ছেন। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তারা এমন একটি যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন, যে যুদ্ধ চলতি বছর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোযোগ কেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত ক করে তুলেছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ সামনে আনলেও সম্মেলনের আয়োজক ভারত এ জোটের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টায় আছে। কারণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, তেহরান ও আবুধাবি এই যুদ্ধে বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর ছয় মাসের বেশি সময় পর এ সম্মেলন হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হয় ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এদের বাইরে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, মিশর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। উদীয়মান দেশগুলোর এই জোট গড়ে ওঠে মূলত পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর লক্ষ্যে। তবে বছর বিশেক হলো যাত্রা শুরু করা এ জোট নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, বিশ্বকে বহুমুখী করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের ভূমিকা থাকলেও পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তারা বেশ হিমশিম খাচ্ছে। পশ্চিমাদের নেতৃত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা দক্ষিণের দেশগুলোকে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে আরও ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক বিকল্প এনে দিয়েছে। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ডলারের আধিপত্য এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে। আর পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ। কিছু বিশ্লেষকের মতে, পশ্চিমাদের বিকল্প হতে পারছে কিনা, সেটা ব্রিকসের সাফল্যের মাপকাঠি নয়; দেখতে হবে, পশ্চিমা আধিপত্যকে তারা কঠিন করে তুলতে পারছে কিনা। ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গোদিনহো আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা ব্রিকস নেতৃত্বাধীন সব উদ্যোগকে খাটো করে দেখি, কারণ এটি আমাদের প্রত্যাশার বিপ্লব নয়।” আল জাজিরার প্রশ্নের জবাবে লিখিতে উত্তরে এই দুই গবেষক বলেন, “এটা ঠিক যে, নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ইস্যু মোকাবিলায় জাতিসংঘের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা সক্ষমতা ব্রিকসের নেই। কিন্তু এই জোটের অস্তিত্বই দক্ষিণের দেশগুলোর নিজেদের মতামতের জানান দেয়। এছাড়া সহযোগিতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বকে পাশ কাটানোর জন্য এই জোট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্যেই জন্ম কোনো কোনো বিশ্লেষকের যুক্তি, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ব্রিকসের জন্ম হয়নি; তাদের মূল লক্ষ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ক্ষমতার বলয়কে চ্যালেঞ্জ জানানো। ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয় এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) দোহা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার কারণেই মূলত ব্রিকসের উত্থান ঘটে। দোহা সংলাপ ছিল এমন এক বাণিজ্য আলোচনা, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা সংস্কার করা। অলিভেইরা ও গোদিনহো বলেন, যেসব দেশকে পরবর্তী ‘উন্নত রাষ্ট্র’ ভাবা হচ্ছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল, একটি প্ল্যাটফর্মে আসতে পারলেই তাদের কণ্ঠ সবচেয়ে ভালোভাবে শোনা যাবে। ব্রাজিলের এই দুই গবেষকের মতে, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান এসব শক্তি আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। সেই লক্ষ্যের জায়গা থেকে দেখলে, এই জোটের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক শন বার্গেস। তার মতে, ব্রিকসের দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে অগ্রাধিকার রয়েছে। একটি হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন। আরেকটি হলো, অধিকার ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যর্থতা কোথায়, সে বিষয়ে পশ্চিমাদের নীতিকথা শোনানোর অবসান ঘটানো। বেশির ভাগ বিশ্লেষক একমত যে, ভেঙে পড়তে থাকা উদার বিশ্বব্যবস্থাকে উৎখাত করার চেয়ে সংস্কার ও আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন অর্জনই ব্রিকসের জন্য অনেক বড় উদ্বেগের বিষয়। বার্গেস প্রশ্ন করেন, ব্রিকস কেন জি- সেভেনের সদস্য দেশগুলোর বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিতে যাবে? তার ব্যাখ্যায়, ব্রিকস তাদের সদস্য দেশগুলোকে এমন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিকল্প পথ তৈরি করে দিয়েছে, যা তাদের স্বার্থ, বিশেষ করে জাতীয় উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। বার্গেস বলেন, শর্তহীন উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্ব দেওয়া এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুদ্রা বিনিময় নিয়ে ব্রাজিলের আলোচনা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট দুটি উদাহরণ। এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যেই নয়, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। ভূরাজনৈতিক ও নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক গাই বার্টন বলেন, একবিংশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিকসের ধারণা ও আনুষ্ঠানিক যাত্রার সময় ‘পশ্চিম’ বলতে যা বোঝানো হত, সেই ধারণাও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। তখনকার তুলনায় এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস কাজ করছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, পশ্চিমের ধারণাটিই এখন ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। ফলে ব্রিকস আসলে কাকে বা কোন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করছে, আমেরিকা নাকি ইউরোপ, সেটাই তো এখন স্পষ্ট নয়। এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যেই নয়, সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। বড় অর্থনৈতিক শক্তি, সীমিত সম্মিলিত ক্ষমতা বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, ব্রিকসের অর্থনৈতিক শক্তি যতটা বিশাল, সেটাকে সম্মিলিতভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা ততটা নয়। ভূকৌশল বিশ্লেষক ও ফরেন পলিসি ইন ফোকাসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইমরান খালিদ বলেন, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশ, বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর দখলে। আইএমএফের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বছর ১১ সদস্যের এ জোটের অর্থনীতি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে, যেখানে জি-সেভেনের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ। খালিদ বলেন, ব্রিকসের আকার যতটা, সেই তুলনায় তাদের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা দুর্বল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সক্ষমতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত মার্কিন ডলারের ওপর তাদের কাঠামোগত নির্ভরতা। ব্রাজিলের দুই গবেষক বলেন, ডলার নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও ব্রিকসের অধিকাংশ বাণিজ্য এখনও ডলারেই হয়। আবার অধিকাংশ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্র রিজার্ভ হিসেবে ডলারই ব্যবহার করেন। খালিদ বলেন, সামগ্রিকভাবে ব্রিকস ডলার থেকে সরে যাচ্ছে না। তবে সদস্য দেশগুলো একেকটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ডলার নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে। আকাঙ্ক্ষায় ঐক্য, স্বার্থে বিভক্তি বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতাই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এটিই আবার জোটটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে। কারণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বার্থগত নানা বিভেদ রয়েছে। মে মাসে ভারতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়। সেখানেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি জোটের সদস্যরা। খালিদ বলেন, মে মাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। কারণ ইরান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কথা বিবৃতিতে তুলে ধরা হোক। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে রাজি হয়নি। তবে বর্তমান যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতির সব উদ্যোগই দক্ষিণের দেশগুলো থেকে এসেছে বলে তুলে ধরেন খালিদ। তার ভাষ্য, ওয়াশিংটন থেকে কোনো উদ্যোগ আসেনি। বিভেদের উদারহণ টানতে গিয়ে বার্টন বলেন, ব্রিকসের সদস্যপদ তেহরানকে একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জোটের সদস্যরা ইরানের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান এক করে ফেলেছে। বার্টন বলেন, একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন— এমন কোনো নীতি ব্রিকসে নেই। সদস্য দেশগুলো ইচ্ছা করেই স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা ধরে রেখেছে, যা একটি সমন্বিত জোটের ঠিক বিপরীত। বার্টনের মতো করে বার্গেসও বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরও বড় পরিসরে কথা বলার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ব্রিকসের থাকলেও সেখানে মতভেদ রয়েছে। সব সদস্যই আরও বেশি কথা বলার সুযোগ চায়, কিন্তু তারা যে বার্তা দেবে, তাতে মোটেও ঐক্যের বার্তা নেই। তাহলে কি ব্রিকস সত্যিই পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করছে? সামগ্রিকভাবে ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম বলে মনে করেন খালিদ। তার মতে, অভিন্ন মুদ্রা নেই, অভিন্ন শুল্ক নেই, প্রতিরক্ষা সহযোগিতারও কোনো অঙ্গীকার নেই—তাই এটিকে প্রচলিত অর্থে কোনো ভূরাজনৈতিক জোট বলা কঠিন। তবে ব্রিকস পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং বাণিজ্য সহজ করেছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে। তার ভাষায়, এই জোট একই সঙ্গে দক্ষিণের দেশগুলোকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ব্রিকসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ তুলে ধরতে গিয়ে খালিদ বলেন, কোনো একটি দেশের ওপর পশ্চিমা দেশগুলো কতটা কম খরচে চাপ তৈরি করতে পারে— সেটার চ্যালেঞ্জ হিসেবে এই জোটের আবিভাবকে দেখা যেতে পারে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
