ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ২৯ আগস্ট ২০২৬ ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩
ইরান যুদ্ধের ছয় মাস: কে কতটা জিতল?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Saturday, 29 August, 2026, 9:57 AM

ইরান যুদ্ধের ছয় মাস: কে কতটা জিতল?

ইরান যুদ্ধের ছয় মাস: কে কতটা জিতল?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যখন ইরানের ওপর হামলা শুরু করলেন, তখন তিনি একে একটি ‘এক্সকার্শন’ বা ছোটোখাটো ‘সামরিক ভ্রমণ’ হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন, যার মেয়াদ হবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ।

কিন্তু ছয় মাস পর, সেই সামরিক অভিযান কেবল পশ্চিম এশিয়া নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

ইরানের জনগণের জন্য, পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী কোটি কোটি মানুষের জন্য এবং বিশ্বজুড়ে বাড়তি খরচের চাপে থাকা ভোক্তাদের জন্য একটি বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এ যুদ্ধ।

তবু ট্রাম্পের লক্ষ্যগুলো অপূর্ণই রয়ে গেছে, যদিও সেই লক্ষ্য বারবার বদলে যেতে দেখা গেছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক হামলার প্রথম দিনই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন, তার ছেলে গুরুতর আহত হন। সেই চরম আঘাতের পরও ইরানের সরকার এখন পর্যন্ত টিকে আছে এবং তারা বিশ্বাস করে, সময় তাদের পক্ষেই কাজ করছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন ইরানে নিজেদের তৈরি করা এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় নিজেদের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করছে।

জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুদ্ধের তীব্রতা কমেছে, কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা এখন একটি বিষয়ে মোটামুটি একমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সামরিক অভিযানের ফলে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটবে না, কিংবা ওয়াশিংটন কোনো চূড়ান্ত ও সুস্পষ্ট বিজয়ও পাবে না।

বরং এই যুদ্ধ এখন একটি দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা এবং একে অপরকে দুর্বল করার এক দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক এইচ এ হেলিয়ার আল জাজিরাকে বলেন, “আগামী ছয় মাসের মধ্যে তেহরান সরকারের পতনের কোনো সম্ভাবনাই নেই। যদি অর্থনৈতিক চাপ এভাবেই চলতে থাকে, তবে কয়েক বছর পর হয়ত রাষ্ট্রে একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যে নয়।"

যুদ্ধের লক্ষ্য বদলে গেল যেভাবে

ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কীভাবে সময়ে সময়ে বদলে গেছে, তা এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে সিএনএন।

শুরুতে ইরানকে সম্পূর্ণ পরাভূত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, সেখানে শাসন ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো এবং তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা চিরতরে মুছে ফেলার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের।

সেসব লক্ষ্য এখন শুধু হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরার দাবিতে নেমে এসেছে।

এই পরিবর্তন যুদ্ধের বর্তমান বাস্তবতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বড় সুবিধা থাকলেও সেই শক্তিকে রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন এখন সামরিক হামলার পাশাপাশি ইরানের তেল বিক্রি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখা আর্থিক পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নৌ অবরোধ তেহরানের তেল রপ্তানি ও বিদেশি মুদ্রা পাওয়ার সুযোগ সীমিত করেছে।

কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ইরানের জন্য নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। কয়েক দশক ধরে তেহরান নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। ফলে নতুন চাপ যতই বাড়ুক, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারবে কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন।

অবরোধের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে হরমুজ

ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে হরমুজ প্রণালি, যার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কার্যত ইরানের হাতে।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় তেল, গ্যাস ও অন্যান্য পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা এবং ইরানি বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে হরমুজে বাণিজ্যিক চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় একেবারেই কমে গেছে।

এর সরাসরি চাপ পড়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর। এসব দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তেল ও গ্যাসের আয়ের ওপর নির্ভরশীল।

তারা একই সঙ্গে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার এবং নিজেদের দেশকে বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিল। যুদ্ধ সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।

অস্থির তেলের বাজার বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিবহন ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহে বিঘ্ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।

গালফ রিসার্চ সেন্টারের প্রধান অর্থনীতিবিদ জন স্ফাকিয়ানাকিস প্রশ্ন তুলেছেন, এই পরিস্থিতি আরও ছয় মাস চলবে কি না, কিংবা আরও দীর্ঘ হবে কি না।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোনো দেশ যদি ভবিষ্যতে অন্য কোনো আন্তর্জাতিক নৌপথকে রাজনৈতিক বা সামরিক চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, হরমুজের ঘটনা তার জন্য একটি নজির হয়ে উঠতে পারে।

এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে যুদ্ধের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্য ও সার পরিবহন—সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথে দীর্ঘস্থায়ী বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব কত দ্রুত বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর নতুন হিসাব

যুদ্ধ শুধু অর্থনীতির হিসাব বদলায়নি, নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে উপসাগরীয় দেশগুলোকে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই দেশগুলো আগে থেকেই তাদের অর্থনীতি বহুমুখী করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বাইরে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব বাড়ানোর কথা ভাবছিল। যুদ্ধ সেই প্রবণতাকে আরও দ্রুত করেছে।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের ভাষায়, যুদ্ধ এমন কোনো প্রবণতা তৈরি করেনি যা আগে ছিল না; বরং বিদ্যমান প্রবণতাগুলোকে ত্বরান্বিত করেছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো যে আগে থেকেই প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছিল, তার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের সামরিক অংশীদারত্ব এই অঞ্চলে আরও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ যুদ্ধের একটি দীর্ঘমেয়াদি ফল হতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তন। এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছিল এই কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি।

এখন আঞ্চলিক দেশগুলো সেই নির্ভরতার পাশাপাশি নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও বিকল্প অংশীদারত্ব বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।

শত চাপেও টিকে আছে ইরান

যুদ্ধের সবচেয়ে গভীর চাপ পড়েছে ইরানের সাধারণ মানুষের ওপর।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জুলাইয়ে দেশটির বামূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছর আগের তুলনায় ভোক্তা মূল্য বেড়েছে ৮৭ দশমিক ৯ শতাংশ। খাদ্যের দাম বেড়েছে ১২৮ শতাংশ।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের সমস্যা কয়েক গুণ বেড়েছে, একই সঙ্গে আয় কমেছে।

অর্থনৈতিক সংকট অবশ্য ইরানে নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের একটি মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানের মানুষের অসন্তোষ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সেই অসন্তোষ যে সরকারের পতনে রূপ নেবে, তার নিশ্চয়তা নেই।

বরং ইরানকে অতীতেও নানামুখী চাপ সামলে টিকে থাকার উপায় বের করে নিতে দেখা গেছে।

ফলে নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধের মেয়াদও দীর্ঘ করতে পারে।

চীন ও ভারতের ভূমিকা

ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা কৌশলের আরেকটি বড় প্রশ্ন হল—ইরানের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা দেশগুলো কতটা যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মেনে চলবে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা তৃতীয় পক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু তেহরান মনে করছে, তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের মত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করা ওয়াশিংটনের জন্য সহজ হবে না।

ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, চীনের মত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করবে না বলেই তাদের বিশ্বাস।

এই বাস্তবতা যুদ্ধকে শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বা ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

তাতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারসাম্যের খেলা কঠিন হয়ে উঠেছে। একদিকে তেহরানের ওপর চাপ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সেই চাপ এমন পর্যায়ে নেওয়া যাবে না, যাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম আরও বাড়ে এবং মিত্র দেশগুলোর অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইউক্রেইনে

ইরান যুদ্ধের প্রভাব পশ্চিম এশিয়ার বাইরে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ইউক্রেইন যুদ্ধে।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলা মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করেছে। এর ফলে ইউক্রেইনের জন্য নির্ধারিত কিছু গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পশ্চিম এশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সিএনএনকে বলেছেন, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে প্রয়োজনের মাত্র এক-দশমাংশ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র তার দেশের হাতে ছিল।

সিএনএন লিখেছে, এর ফল হয়েছে মারাত্মক। ২০২২ সালের মে মাসের পর চলতি গ্রীষ্মে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সময় পার করেছে ইউক্রেইনের বেসামরিক মানুষ।

অন্যদিকে হরমুজ সংকট রাশিয়ার জন্য কিছু অপ্রত্যাশিত সুবিধা তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ায় মস্কোর জ্বালানি বিক্রির সুযোগ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল রপ্তানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এর ফলে ইউক্রেইন যুদ্ধ চালাতে বাড়তি অর্থের যোগানা পাচ্ছে রাশিয়া।

অর্থাৎ, ইরানকে চাপে ফেলতে গিয়ে রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের একটি অংশ দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সামনে কী?

ছয় মাসের হিসাব বলছে, এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—কোনো পক্ষই এখনো এমন ফল অর্জন করতে পারেনি, যা দিয়ে সংঘাতের একটি পরিষ্কার সমাপ্তি টানা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করুক এবং পারমাণবিক কর্মসূচি আর কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে না পারুক।

ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার হোক, কিন্তু এমনভাবে নয়, যাতে সেটিকে তেহরানের আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখা যায়।

উপসাগরীয় দেশগুলো চায় যুদ্ধ থামুক, কিন্তু একই সঙ্গে এমন কোনো ফলও চায় না যাতে ইরান নিজেকে বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করতে পারে এবং হরমুজে চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা ধরে রাখে।

এই তিনটি অবস্থানের মধ্যে সমঝোতার জায়গা খুবই সংকীর্ণ।

রয়টার্স লিখেছে, এটি একটি ‘বিপজ্জনক অচলাবস্থা’। কারণ সামরিক সংঘাতের তীব্রতা কমলেও রাজনৈতিক সমাধানের পথ এখনো স্পষ্ট নয়।

ইরানের জন্য কৌশলটি তুলনামূলকভাবে সরল—টিকে থাকা। দেশটির নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, সময় যত গড়াবে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্যও বাড়বে।

অন্যদিকে ওয়াশিংটনের সামনে প্রশ্ন হল, ঠিক কোন ফলকে ‘যথেষ্ট’ বলে মেনে নিয়ে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।

যদি লক্ষ্য হয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং দেশটির রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে ফেলা, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ চালিয়ে যেতে হবে।

আর যদি লক্ষ্য হয় পারমাণবিক কর্মসূচিকে এমন পর্যায়ে দুর্বল করা, যাতে তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা না যায়, তাহলে তুলনামূলকভাবে সীমিত সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।

কিন্তু সেই পথও সহজ নয়। কারণ যুদ্ধের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় নিরাপত্তা, বিশ্ব জ্বালানি বাজার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার প্রশ্ন।

জয়-পরাজয়ের বাইরে

যুদ্ধের এই ছয় মাসে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, আর তা হল আধুনিক যুদ্ধে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব আর রাজনৈতিক বিজয় এক জিনিস নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা ইরানের সক্ষমতার ওপর বড় আঘাত করেছে—এমন দাবি ওয়াশিংটন করছে।

কিন্তু একই সময়ে ইরানের সরকার টিকে আছে এবং যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাও ধরে রেখেছে।

ইরানের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যের দাম বেড়েছে, জনগণের ওপর চাপ বাড়ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট এখনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতন ঘটায়নি।

উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধের মধ্যে পড়ে নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুন করে সাজাচ্ছে। চীন ও ভারতের মত শক্তির সঙ্গে সম্পর্কও এই নতুন সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এটি এমন একটি সংঘাতে পরিণত হয়েছে, যার প্রতিটি অতিরিক্ত দিন শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নয়, পশ্চিম এশিয়া এবং তার বাইরের দেশগুলোর অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও নতুন খরচ চাপাচ্ছে।

তাই ‘কে জিতছে’ তা এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নয়।

বড় প্রশ্ন হল, কে কত দিন এই অচলাবস্থার খরচ বহন করতে পারবে, এবং শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ আগে এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে, যাকে নিজের পরাজয় বলে মনে হবে না।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status