ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১৩ জুন ২০২৬ ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কী আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এই টার্মিনালে, কেন এত আলোচনা?
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Saturday, 13 June, 2026, 12:15 PM
সর্বশেষ আপডেট: Saturday, 13 June, 2026, 12:18 PM

কী আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এই টার্মিনালে, কেন এত আলোচনা?

কী আছে চট্টগ্রাম বন্দরের এই টার্মিনালে, কেন এত আলোচনা?

চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান চারটি টার্মিনালের (জিসিবি, এনসিটি, সিসিটি ও পিসিটি) মধ্যে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। এর ওপর ভর করেই বন্দরের সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয়। তাই অনেকে এনসিটিকে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ও বলে থাকেন। এজন্য এটি পেতে শেখ হাসিনা সরকারের সময় থেকে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ আলোচনার মাঝে দেশীয় কোম্পানি এমজিএইচ প্রস্তাবনার পর আরও তিন কোম্পানি একটি কনসোর্টিয়াম করে একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে সরকারের কাছে। শেষ পর্যন্ত পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে যাচ্ছে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। ইতিমধ্যে দেশি-বেদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনার কাজ পেতে সরকারকে প্রস্তাবনা দিয়েছে। এখন চলছে যাচাই-বাছাই। শেষ পর্যন্ত কে পাচ্ছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তবে দীর্ঘদিন ধরে এনসিটি ইজারা নিয়ে আন্দোলনে থাকা শ্রমিক সংগঠনগুলো ইজারার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আবারও সরব হচ্ছে। তাদের দাবি, স্বয়ংসম্পূর্ণ এনসিটি বর্তমানে নৌবাহিনীর হাতে ভালোই চলছে।

পরিচালনা করতে চাইছে দেশীয় তিন প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়াম 

এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড, কসমস এন্টারপ্রাইজ এবং এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড নিয়ে গঠিত তিন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামও প্রস্তাব দিয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে এই কনসোর্টিয়ামের পক্ষ থেকে ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাবটি দেওয়া হয়। বিষয়টি সম্প্রতি জানাজানি হয়।

গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এক চিঠিতে এনসিটি ইজারায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় সরকার। এই নির্দেশনা সামনে আসার পর প্রায় দেড় মাস আগের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়টি জানা গেলো। সাইফ পাওয়ার টেক ২০০৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। তার সঙ্গে নতুন করে দুই প্রতিষ্ঠান সঙ্গী হলো। 

এ কনসোর্টিয়ামের দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়, প্রতি একক কনটেইনার পরিচালনা বাবদ ৬৯ ডলার চেয়েছে এই তিন কোম্পানির জোট। আর জাহাজ ও কনটেইনার সংক্রান্ত সব মাশুল আদায় করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে আগামী ১৫ বছর জ্বালানি, বিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল খরচসহ কোনও ধরনের পরিচালনা ব্যয় ছাড়াই প্রতি একক কনটেইনারে প্রায় ৯২ ডলার রাজস্ব বন্দর পাবে বলে ওই প্রস্তাবে বলা হয়।

এ প্রসঙ্গে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, আমরা দীর্ঘমেয়াদে এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছি, ইজারা নয়। এই সময়ে মাশুল আদায় করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দেশীয় প্রতিষ্ঠান এনসিটি পরিচালনা করলে দেশের সক্ষমতা বাড়বে। সবার আগে বাংলাদেশ ধারণার আলোকেই আমরা প্রস্তাব দিয়েছি।

আলোচনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড

গত ৪ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাবরে জারি করা পৃথক দুটি চিঠিকে ঘিরে আবারও আলোচনায় স্থান পেয়েছে দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। ওই দিন সকালে জারি করা প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নেওয়া অথবা তা বাতিলের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। তবে একই দিন কয়েক ঘণ্টা পর বিকালে পাঠানো আরেকটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা ও দর কষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং গর্ভমেন্ট টু গর্ভমেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় ওই উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আবার এই প্রক্রিয়া গতিশীল হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তি হয়ে যাওয়ার জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যান বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটিতে বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি বছরের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্ল্যাটফর্মের সভায় আবার বিষয়টি আলোচনায় আসে। এনসিটির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে সমন্বিত টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব দেয় ডিপি ওয়ার্ল্ড।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে সরকারি বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ও গর্ভমেন্ট টু গর্ভমেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর আওতায় ১৫ বছরের জন্য পুরো টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে ইজারার প্রস্তাব রয়েছে। এই ব্যবস্থায় টার্মিনাল পরিচালনা, মাশুল আদায় ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দায়িত্ব থাকবে অপারেটরের হাতে। বিনিময়ে বন্দর শুধু নির্ধারিত রাজস্ব পাবে।

বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা করছে কে

বন্দরের চারটি সচল কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। ২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়ছে। 

সর্বশেষ গত মে মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় ৯৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি বড় কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়। এখানে রয়েছে বিশ্বমানের গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। এনসিটির বার্ষিক সক্ষমতা ১১ লাখ টিইইউস হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি।

কারা চালাচ্ছে বন্দরের বাকি তিন টার্মিনাল

বন্দরের অন্য টার্মিনালগুলোর মধ্যে চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা করছে সাইফ পাওয়ার টেক। জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) পরিচালনা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই। আর পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনা করছে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটিই)। ২০২৪ সালের জুন থেকে বিদেশি এই প্রতিষ্ঠানটি পিসিটি পরিচালনা করছে এবং চুক্তি অনুযায়ী নিজস্ব সরঞ্জাম ব্যবহার করে ২২ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা না দেওয়ার দাবি স্কপের

এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা না দেওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গত বুধবার (১০ জুন) চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান স্কপের নেতারা। পরে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন তারা।

স্কপের যুগ্ম আহ্বায়ক এস কে খোদা তোতন বলেন, এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড সক্রিয় হলে ফের কঠোর আন্দোলনে যাবো। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলনের মুখে বিদেশিদের বন্দর দেওয়া থেকে সরে গিয়েছিল। নতুন করে আবার তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে শুনছি। এটি আমরা মেনে নেবো না।’

বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, এ বিষয়ে নৌ মন্ত্রণালয়ের দুটি চিঠি আমাদের বিস্মিত করেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার আন্দোলনের মুখে এই উদ্যোগ থেকে সরে এলেও বর্তমান সরকার কেন আবার বিষয়টি সামনে আনছে, তা বোধগম্য নয়। এনসিটি দেশের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ পরিচালনা করে এবং এর আয়ও রেকর্ড পরিমাণ। বর্তমান সরকার যদি বিদেশিদের কাছে এনসিটি দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে পুনরায় আন্দোলন শুরু হবে।

যা বললেন বন্দরের সচিব

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. নাসির উদ্দিন বলেন, এনসিটি নিয়ে বন্দরে নতুন কোনও নির্দেশনা আসেনি। দেশীয় নাকি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করবে মন্ত্রণালয়। কথাবার্তা সবই চলছে মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত দেবে আমরা তা বাস্তবায়ন করবো।

কেন এত আলোচনা

মূলত সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ভিত্তিক বৈশ্বিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এই টার্মিনালটি দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ, এর বিপরীতে দেশীয় অপারেটরদের প্রতিযোগিতার কারণেই এটি নিয়ে এত আলোচনা চলছে। আবার এটি দেশের সবচেয়ে বড় ও লাভজনক টার্মিনাল। বন্দরের সর্ববৃহৎ এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনালও। বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানো-নামানোর (হ্যান্ডলিং) প্রায় ৪৪ থেকে ৫০ শতাংশ একাই সামলায় এনসিটি। বন্দরের তৈরি একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও পুরোদমে সচল ও লাভজনক সম্পদ, যা থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পায়। এজন্য সবাই পেতে চায়। 

সমালোচক ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, এটি একটি সম্পূর্ণ সচল টার্মিনাল যেখানে নতুন করে বড় কোনও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। তাই তৈরি করা লাভজনক সম্পদ নিয়ে সবাই লাভবান হতে চাচ্ছে। এ অবস্থায় কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে আপত্তি উঠছে বারবার। এ ছাড়া বিদেশি অপারেটর দায়িত্ব নিলে স্থানীয় প্রায় ৩ হাজার ৮০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে, এই আশঙ্কায় বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীরা দীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন করছেন।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status