|
ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় কে কী চায়?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ইউক্রেইন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় কে কী চায়? প্রথমে বৈঠকটি দুই প্রেসিডেন্ট— যুক্তরাষ্ট্রের ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেইনের ভলোদোমির জেলেনস্কির—মধ্যে হওয়াটাই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু এখন তা শীর্ষ বৈঠকের চেয়েও বেশিকিছু হতে চলেছে। কারণ এ বৈঠকে অংশ নিতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, ফিনল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং নেটোর নেতারা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছেন। তারা তিন বছর ধরে ইউক্রেইনে চলা রাশিয়ার যুদ্ধ কীভাবে শেষ হওয়া উচিত এবং কোন শর্তে তা হওয়া উচিত, তা নিয়ে মত প্রকাশ করতে এই বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন। ঝুঁকি কতটা বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখন ইউক্রেইনের পক্ষে কম সুবিধাজনক ভেবে ইউরোপ কতটা উদ্বিগ্ন- এ বৈঠক তারই প্রতিফলন। বৈঠকে দীর্ঘসময়ের আলোচনা শেষে, যারা সেখানে উপস্থিতি ছিল, আর যারা ছিল না--সব পক্ষই কী চেয়েছে এবং কোন বিষয়টিকে নিজেদের জয় বলে ধরে নেবে তা বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করেছে বিবিসি: যুক্তরাষ্ট্র চায় একটি চুক্তি, যে কোনও চুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল তিনি প্রথম দিনেই এই সংঘাত সমাধান করবেন। কিন্তু ছয় মাস পরও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। ট্রাম্পের কাছে চুক্তির শর্তগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়; চুক্তি সম্পন্ন হওয়াটাই প্রধান, যেহেতু শর্তগুলো সময়ে সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। আলাস্কায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গত শুক্রবারের বৈঠকের পর ট্রাম্প মস্কোর সমালোচনা এবং তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানোর হুমকি থেকে সরে গিয়ে বরং এর পরিবর্তে জেলেনস্কির ওপর চাপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রোববার রাতে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেইনকে নেটোতে যোগদানের আশা ত্যাগ করতে হবে এবং ক্রাইমিয়াও তারা আর ফেরত পাবে না, যেটি ২০১৪ সালে পুতিন অবৈধভাবে রুশ ভূখন্ডের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, ওয়াশিংটন ইউরোপকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে যাতে ভবিষ্যতে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকানো যায়। তবে বিস্তারিত এখনও অস্পষ্ট। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয়দের দাবির বিরোধিতা করেছে যে, তারা ইউক্রেইনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হোক। হোয়াইট হাউজের বৈঠকে বিশ্ববাসীর নজর থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান সত্যিই বদলেছে কি না তা দেখার জন্য। ইউক্রেইন চায় যুদ্ধবিরতি, ছাড়তে চায় না অঞ্চল: ইউক্রেইন প্রথমেই চায় একটি যুদ্ধবিরতি। ইউক্রেইনের শহরগুলো প্রতিনিয়ত রাতের অন্ধকারে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হচ্ছে। ইউক্রেইনের নেতৃত্ব বলছে, ধ্বংসস্তূপ ও মৃত্যুর সাক্ষী নগরীতে বসে স্থায়ী শান্তি চুক্তি করা সম্ভব নয়। ইউরোপীয় মিত্ররা এ পর্যন্ত ‘প্রথমে যুদ্ধবিরতি’ করার শর্ত পুরোপুরি সমর্থন করেছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি আগে রাশিয়াকে একাধিকবার যুদ্ধবিরতির করার জন্য আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন, এখন তিনি আর তা চাইছেন না। ট্রাম্প বরং এখন রাশিয়ার সঙ্গে একমত হয়ে আলোচনা সরাসরি স্থায়ী শান্তি চুক্তির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাক সেই পরামর্শই দিচ্ছেন। ইউক্রেইনের আদর্শ শান্তি চুক্তি হবে- রাশিয়ার অবৈধভাবে দখল করা বা আংশিক দখল করা সব এলাকা ফেরত পাওয়া। ২০১৪ সালে রাশিয়ার দখল করে নেওয়া ক্রাইমিয়া উপদ্বীপ এবং ইউক্রেইনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের চারটি অঞ্চল—খেরসন, জাপোরিঝিয়া দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক সবই ফেরত পাওয়া। তবে তিন বছর ধরে চলা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে পশ্চিমা সহায়তা থাকলেও, সামরিকভাবে যুদ্ধ জয়ের জন্য ইউক্রেইনের পর্যাপ্ত জনবল নেই। তাই ইউক্রেইনের সামনে অস্বস্তিকর একটি চুক্তি উপস্থাপন করা হবে- তেমন সম্ভাবনাই বেশি; যে চুক্তিতে ইতিমধ্যেই রাশিয়ার দখলে থাকা অধিকাংশ অঞ্চল ইউক্রেইনকে ছেড়ে দিতে বলা থাকবে। ইউক্রেইন পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোতে যোগ দিতে চাইবে; যাকে তারা ভবিষ্যতে রাশিয়ার আগ্রাসন থেকে সবচেয়ে ভাল সুরক্ষা ব্যবস্থা বলেই মনে করে। তবে ট্রাম্প বলে দিয়েছেন, নেটোতে যোগ দিতে পারবে না ইউক্রেইন। এর পরিবর্তে, ইউক্রেইনকে তাদের মিত্রদেশগুলোর কাছ থেকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা’ ব্যবস্থা মেনে নিতে বলা হতে পারে, যার বিস্তারিত এখনও ঠিক হয়নি। রাশিয়া চায় ইউক্রেইনের আরও জমি ও কিইভে অনুগত সরকার: হোয়াইট হাউজে সোমবারের বৈঠকে রাশিয়ার কোনও প্রতিনিধি থাকছেন না। তবে সেটি কোনও বিষয় নয়। কারণ, গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে তার অবস্থান যথেষ্টই শক্ত করে নিতে পেরেছেন। তাই রাশিয়ার দৃষ্টিকোন যে সোমবারের বৈঠকে ভালভাবেই তুলে ধরা হবে, সে ব্যাপারে মস্কো নিশ্চিত থাকতে পারে। ট্রাম্প এরই মধ্যে ইউক্রেইনে বলেই দিয়েছেন, তারা নেটোতে যোগ দিতে পারবে না। রাশিয়াও চায় এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হোক। প্রেসিডেন্ট পুতিন যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই তার “সর্বাধিক দাবিতে” অটল। মূলত ইউক্রেইনকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা এবং কিইভে মস্কোপন্থি প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় বসানো। রুশ কর্মকর্তারা একে “যুদ্ধের মূল কারণ” হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে দেখা যাচ্ছে, পুতিন যুদ্ধ শেষ করতে রাজি হতে পারেন- যদি ইউক্রেইন দোনেৎস্কের অবশিষ্ট ৩০% অঞ্চল ছাড়তে রাজি থাকে। ইউক্রেইনের দনবাস অঞ্চল পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় রাশিয়া। এর মানে হল: কিইভকে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চল রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিতে হবে। এটি ইউক্রেইনের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত হবে, কারণ ওই অঞ্চলেই তাদের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিরক্ষা রেখা রয়েছে, যা কিইভে ভবিষ্যতে রুশ অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সহায়ক। এছাড়া, এটি ইউক্রেইনের সংবিধানেরও পরিপন্থি। এপর্যন্ত রাশিয়া সব যুদ্ধবিরতির দাবি এবং ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার হুমকিও সফলভাবে ঠেকাতে পেরেছে। তবে এটি স্পষ্ট যে, তারা ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে—যুদ্ধ শেষ হলেই মার্কিন-রুশ সহযোগিতার বড় সুফল পাওয়া সম্ভব। আর এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল: মস্কো ট্রাম্পের মধ্যে এমন এক ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে যে, যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি করার দায়িত্ব জেলেনস্কির। যদিও মস্কো জানে, জেলেনস্কি জমি ছাড়তে রাজি হবেন না। এই টানাপোড়েনে ট্রাম্প চূড়ান্তভাবে আলোচনার টেবিল থেকে সরে গেলে তা হতে পারে রাশিয়ার জন্য বিজয়। ইউক্রেইনের নিরাপত্তা চায় ইউরোপ: ইউক্রেইনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে তা সোমবারের বৈঠকে ইউরোপের নেতারা ট্রাম্পের কাছ থেকে জানতে চাইবেন। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অস্পষ্ট বক্তব্য ইউরোপের নেতাদের জন্য উদ্বেগের। তারা মনে করেন, ভবিষ্যতে রাশিয়ার সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশ্বাসযোগ্য অঙ্গীকার পেতে হবে। গত সপ্তাহে আলাস্কায় ট্রাম্প ও পুতিন বৈঠক হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের নেতাদের মধ্যে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়েছিল। সে সময় ট্রাম্প রাশিয়ার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন তিনি আবার রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছেন বলেই মনে হচ্ছে। বৈঠকে ইউরোপের নেতারা ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন যে, তারা ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে এখনও আগের মতোই উদ্বিগ্ন। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
