ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪ ১০ শ্রাবণ ১৪৩১
অধ্যাপক ইউনুসের বিশ্বজনীন প্রচারণা ও নির্মম বাস্তবতা
এম এ হোসাইন
প্রকাশ: Wednesday, 3 July, 2024, 1:23 PM

অধ্যাপক ইউনুসের  বিশ্বজনীন প্রচারণা ও নির্মম বাস্তবতা

অধ্যাপক ইউনুসের বিশ্বজনীন প্রচারণা ও নির্মম বাস্তবতা

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস, যিনি নিজেকে ‘মাইক্রোক্রেডিটের জনক’ বা ‘গরীবের ত্রাণকর্তা’ এবং ‘গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে তাকে পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার মাইক্রোক্রেডিট ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ উচ্চ সুদের ঋণ শোধ করতে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও ইউনুস দাবি করেন তার মাইক্রোক্রেডিট মডেলটি প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক বিকল্প পদক্ষেপ কিন্তু তিনি ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে ৩৭-৪৫ শতাংশ উচ্চ সুদ আদায় করে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ঋণ একটি ফাঁদে পরিণত হয় যা গরীব মানুষকে আরও গরীব করে তোলে। দুর্ভাগ্যবশত, বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ, নীতি নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং সংবাদমাধ্যমের সদস্যরা এই কঠোর বাস্তবতা সম্পর্কে একেবারেই অবগত নয়। ইউনুস কৌশলে তার প্রকৃত চেহারা একটি সুপরিকল্পিত প্রচারনার আড়ালে লুকিয়ে রাখেন, যার জন্য তিনি প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ডলার ব্যয় করেন।

মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার মস্তিষ্কপ্রসূত গ্রামীণ ব্যাংক প্রায়শই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করে থাকে, পায় সম্মানজনক পুরস্কার এবং প্রশংসা। একবার, অধ্যাপক ইউনুস বলেছিলেন যে তার এই ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প দারিদ্র্যকে যাদুঘরে পাঠাবে। কিন্তু তার এই  বাহ্যিক ঝলমলে কথার ফুলঝুরির আড়ালে এক হিম-শীতল এবং উদ্বেগজনক বাস্তবতা রয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনুসকে তার তথাকথিত কৃতিত্বের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসা করা হয়ে থাকে এবং অসংখ্য পুরস্কারের মাধ্যমে তার ইমেজ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৮৪ সালে র‌্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ডটি ছিল ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা প্রচারে তার প্রচেষ্টার প্রথম কোন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

এই পুরস্কারগুলো শুধুমাত্র ইউনুসের ব্যক্তিগত ইমেজকেই উন্নত করেনি বরং বৈশ্বিক প্রভাবশালীদের বলয়ে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছে। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার তার মর্যাদাকে আরও সুসংহত করেছে এবং  আন্তর্জাতিক মিডিয়া, সরকার এবং দাতব্য সংস্থাগুলির মনোযোগ আকর্ষণ করতে সাহায্য করেছে। এই বৈশ্বিক প্রচারণা গুলো নিঃসন্দেহে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্য অর্থায়ন এবং সমর্থন আকৃষ্ট করতে সহায়তা করেছে।

ডেনিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক টম হেইনেম্যান বেশ কয়েকটি গোপন নথি প্রকাশ করেছিলেন, যেগুলি দেখায় যে মুহাম্মদ ইউনুস ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য গ্রামীণ-পরিবারের নতুন কোম্পানিতে ১০০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত করেছিলেন যার
বেশিরভাগ তহবিল নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে অনুদান হিসাবে দান করা হয়েছিল। 

টম হেইনেম্যান আরও প্রকাশ করেছেন যে মুহাম্মদ ইউনুস, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তহবিলের বেশিরভাগ অংশ অনুদান হিসেবে পাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি তা গরিব নারী ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে ২১- ৩৭% মধ্যে উচ্চ হারে সুদ আদায় করছিলেন। সাপ্তাহিক ব্লিটজে প্রকাশিত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে টম হেইনেম্যান, ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের বিজ্ঞাপন-মহিলা সুফিয়া বেগমের বিষয়টির সঠিক বাস্তবতা প্রকাশ করেছিলেন।

উচ্চ সুদের হার, আক্রমণাত্মক ঋণ পুনরুদ্ধারের চর্চা এবং ঋণের চক্র তৈরির ফলে ইউনুসের  মডেলের কার্যকারিতা ম্লান হয়েছে। ঋণ শোধের চাপে ঋণগ্রহীতারা প্রায়ই অতিরিক্ত ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন, যার ফলে একটি অসহনীয় আর্থিক ঋণের জালে জড়িয়ে পরতে দেখা গেছে। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ইউনুসের এই ক্ষুদ্র ঋণ মডেলটি কিছু ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতার ভাগ্যকে আরও খারাপ করেছে।

তথাকথিত  ক্ষুদ্র-ঋণ মডেলের সবচেয়ে করুণ ফলাফলগুলির মধ্যে একটি হল ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া ব্যক্তিদের আত্মহত্যার প্রতিবেদন। ঋণ শোধের সময়সূচী মেটানোর চাপ, গ্রামীণ ব্যাংকের দ্বারা নিয়োগকৃত আক্রমণাত্মক পুনরুদ্ধার কৌশলের সাথে মিলিত হয়ে ঋণগ্রহীতাদের শেষ প্রান্তে ঠেলে দেয়। এছাড়াও, গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীদের কাছ থেকে অপমান এড়াতে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তাদের সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। এই ঘটনাগুলি বিচ্ছিন্ন নয়; তারা ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে একটি বিস্তৃত মানসিক চাপ এবং হতাশার প্রতিফলন ঘটায়।

এই আত্মহত্যাগুলির প্রভাব অনেক গভীর। এটি ক্ষুদ্র ঋণ সিস্টেমে একটি গুরুতর ত্রুটি তুলে ধরে এবং গ্রামীণ ব্যাংক এবং তার কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও নৈতিকতা সম্পর্কে  গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। এই সিস্টেমটি চালিয়ে যাওয়া ইউনুস সহ যারা এই ট্র্যাজিক পরিণতি ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।

ইউনুস সম্প্রতি টাইম ম্যাগাজিনে তার পক্ষে প্রচারমূলক লেখা প্রকাশ করতে ৩০০,০০০ মার্কিন ডলার ব্যয় করেছেন। সম্প্রতি, তিনি ফিলিপাইনে চার দিনের একটি ইভেন্ট আয়োজন করেছেন, যার জন্য অতিরিক্ত ৫৭৫,০০০ ডলার ব্যয় করেছেন। তার প্রচারমূলক কার্যক্রমের ফলে প্রশ্ন উঠছে: ইউনুস কি আল কায়েদা-ঘনিষ্ট বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থনে অসাংবিধানিক উপায়ে রাজনীতিতে ফিরে আসার ষড়যন্ত্র করছেন?

বাংলাদেশে ইউনুসের মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রমের কয়েক দশক সত্ত্বেও, জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দারিদ্র্যতার মধ্যে রয়েছে। অর্থনীতিবিদগন দাবি করেন যে মাইক্রোফাইন্যান্স মডেল একটি স্বল্প মেয়াদি ব্যবস্থা যা দারিদ্র্যকে স্থায়ী দূর করতে পারে এমন কাঠামোগত সমস্যাগুলি সমাধান করতে ব্যর্থ হয়।

এছাড়াও, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের উপর ফোকাসটি কখনও কখনও উন্নয়নের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অবকাঠামো থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিয়ে থাকে। এই সেক্টরগুলি টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তবে মাইক্রোক্রেডিটের একক আখ্যান দ্বারা প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে গেছে।

ইউনুসের মডেলের প্রভাব বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে এবং অনুরূপ উদ্যোগকে অনুপ্রাণিত করেছে। তবে, এই প্রকল্প গুলো একই সমস্যাগুলির মুখোমুখি হতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে মাইক্রোফাইন্যান্স খাত একই রকম সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে উচ্চ সুদের হার এবং বলপ্রয়োগমূলক ঋণ পুনরুদ্ধারের চর্চা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে, এই সমস্যাগুলি জনসাধারণের ক্ষোভ এবং পরবর্তীতে সরকারী হস্তক্ষেপের দিকে নিয়ে গেছে।

ফিলিপাইনে, সেন্টার ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট - মিউচুয়াল রিইনফোর্সিং ইনস্টিটিউশনস এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি দরিদ্রদের আর্থিক পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে চেষ্টা করেছে, কিন্তু তারাও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে৷  ইউনূসের কাজের দ্বারা অনুপ্রাণিত প্রতিষ্ঠান, যেমন ইন্দোনেশিয়ার ডমপেট ধুয়াফা এবং পাকিস্তানের আখুয়াত, মিশ্র সাফল্য অর্জন করেছে। 

উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্রঋণের জন্য ডোমপেট ধুয়াফার জাকাতের টাকার ব্যবহার করেছে, কিন্তু এই ধর্মীয় অনুদানের উপর নির্ভরশীলতা মডেলটির সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও প্রশ্ন উত্থাপন করে।  একইভাবে, আখুয়াতের সুদ-মুক্ত ঋণগুলি ক্রমাগত দাতাদের সহায়তার উপর অনেক বেশি নির্ভর করে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।

মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার ক্ষুদ্রঋণ মডেলকে জটিল বাস্তবতার নিরিখে পরীক্ষা করা দরকার। ক্ষুদ্র -ঋণ মডেলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার এবং বিশ্ব স্বীকৃতি এমন বর্ণনা তৈরি করেছে যা প্রায়শই ক্ষুদ্রঋণের ক্ষতিকারক প্রভাব এবং সীমাবদ্ধতাগুলো উপেক্ষীত থাকে।  অবশেষে, ২০১১ সালের মার্চ মাসে, আর্থিক অনিয়ম, পদের জন্য বয়স সীমাবদ্ধতা এবং গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মচারীদের প্রতি আইন ভঙ্গের কারণে সরকার ইউনূসকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়।

মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের সকল কার্যক্রম এবং ক্ষুদ্রঋণ মডেলকে অবশ্যই অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে দেখতে হবে। কেবল পুরস্কার এবং ইতিবাচক গল্পের দৃষ্টিপাতই যথেষ্ট নয়;  আমাদের অবশ্যই কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে এমন সমাধানের দিকে কাজ করতে হবে যা অতিরিক্ত ক্ষতি না করে সত্যিকার অর্থে দরিদ্রদের উন্নতি করতে পারে।  আমাদের নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ  নিশ্চিত করবে যে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পটি প্রতিশ্রুত নৈতিক, টেকসই এবং সত্যিকারের রূপান্তরকারী উপায়ে দারিদ্র্য বিমোচনে বাস্তবায়িত হতে পারে।

লেখক: একজন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

� পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ �







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: [email protected]
কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status