শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, 2০২1
নতুন সময় প্রতিনিধি
Published : Tuesday, 20 July, 2021 at 8:53 PM

বাচ্চাগুলোর কান্না থামাতেই বাটিতে করে বুকের দুধ দিয়েছিকোনো মা যদি একটু বুকের দুধ দেন, সে উদ্দেশ্যেই নবজাতকের এক বাবা উদভ্রান্তের মতো বাটি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। কারণ, তাঁর স্ত্রী সদ্যোজাত সন্তানকে দুধ খাওয়াতে পারছিলেন না। অন্য আরেক মায়ের বুকে দুধ আসে না, তাই হাসপাতালে তিনি তাঁর ননদকে এনে রেখেছেন।

নিজের চারপাশে এ ধরনের অবস্থা দেখে হাসপাতালের বিশেষ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা বাচ্চাদের দুধ দেওয়া শুরু করেন নাদিয়া সিদ্দিকা। মায়ের দুধের জন্য নবজাতকসহ বাচ্চাদের কান্না তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না।  

চলতি মাসের ৭ তারিখ নাদিয়া সিদ্দিকা প্রথম সন্তানের জন্ম দেন। গত সোমবার ১৩ দিন বয়সী সন্তানের এ মায়ের সঙ্গে কথা হয়। নাদিয়ার সন্তানের জন্ম হয় সাভারের একটি ক্লিনিকে। জন্মের পর দুই দিনের মাথায় বাড়ি ফেরার কথা থাকলেও শ্বাসনালিতে দুধ আটকে যাওয়া এবং জন্মগত নিউমোনিয়ার জন্য তাঁর ছেলেকে ভর্তি করতে হয় সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে। বর্তমানে সুস্থ ছেলে নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন নাদিয়া।

নাদিয়া বলেন, ‘ফেসবুকের প্যারেন্টিং বিষয়ক একটি গ্রুপে অনেকে মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে অনেক কিছুর কথা বলেছে। তবে তারা মনে হয় জানেন না মায়ের দুধের কোনো বিকল্প হয় না। এনআইসিইউতে থাকা বাচ্চাকে মায়ের দুধ ছাড়া এক ফোঁটা পানিও খাওয়ানো হয় না। এনাম মেডিকেলের এনআইসিইউর দারোয়ানেরাও বাটি হাতে মায়েদের কাছে গিয়ে অন্য বাচ্চাদের জন্য একটু দুধ দেওয়ার অনুরোধ জানান। আমার বাচ্চা এনআইসিইউতে, সে তেমন খেতেও পারত না। কিন্তু আমার বুকে প্রচুর দুধ, তা ফেলে দিতে কষ্ট হতো। অন্যদিকে চোখের সামনে অন্য বাচ্চাদের শুধু একটু দুধের জন্য কান্না কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতাম না। বাচ্চাগুলোর কান্না থামাতেই বাটিতে করে বুকের দুধ দিয়েছি। একসময় দুধ লাগলেই নাদিয়া মানে আমার খোঁজ পড়ত।’

নাদিয়া বলেন, ‘আমার দুধ–মা হওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না। যাদের দুধ খাইয়েছি, তাদের কারও সঙ্গে ২০-২৫ বছর পর আমার ছেলের বিয়ে হবে কি না, তা চিন্তা করার মতো অবস্থাতেও ছিলাম না। এনআইসিইউর বেশির ভাগ বাচ্চারই অবস্থা খুব খারাপ থাকে।’

হাসতে হাসতে এই মা বললেন, ‘আমি যতগুলো বাচ্চাকে দুধ দিয়েছি, কাকতালীয়ভাবে সবাই ছেলে বাচ্চা। তাই ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ের সম্ভাবনা নেই। আসলে আমি যখন দুধ দিয়েছি, তখন শুধু ভেবেছি, এই বাচ্চাগুলোও সুস্থ হয়ে মায়ের বুকে ফিরে যাক।

যেই বাটিতে দুধ দিতেন সেখানে নবজাতকের মায়ের নাম ও কতটুকু দুধ দিয়েছেন তা উল্লেখ করে দিতেন।  

নাদিয়া বললেন, ‘ভালো খবর হলো যে বাবাটা বাটি হাতে ঘুরতেন, আমি হাসপাতালে থাকতে থাকতেই শুনে এসেছি তাঁর স্ত্রী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন এবং এই মা নিজেও অন্য বাচ্চাদের দুধ দেওয়া শুরু করেন।’

ক্যানসার রোগীদের পরচুলা বা উইগ বানানোর জন্য নিজের চুল কেটে একটি সংস্থাকে দান করেন নাদিয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তখনো অনেক কথা শুনতে হয়। এবারও অনেকে অনেক কিছু বলেছেন। তবে আমার স্বামী এবং পরিবারের সদস্যরা চুল ডোনেট এবং দুধ দেওয়ার কাজটিকে সাপোর্ট করেছেন।’

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করে ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাংক’। ঢাকা জেলার মাতুয়াইলের শিশু-মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইসিএমএইচ) নবজাতক পরিচর্যা কেন্দ্র (স্ক্যানো) এবং নবজাতক আইসিইউর (এনআইসিইউ) নিজস্ব উদ্যোগ ছিল এটি। ব্যক্তি উদ্যোগ এবং বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় মিল্ক ব্যাংকটি স্থাপনে এক কোটি টাকার বেশি খরচ হয়।

আইসিএমএইচের সহযোগী অধ্যাপক এবং হাসপাতালের স্ক্যানো, এনআইসিইউ প্রধান মজিবুর রহমান হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানালেন, ইনস্টিটিউটের দোতলায় হিউম্যান মিল্ক ব্যাংকের জন্য পাস্তুরাইজিং মেশিন, অত্যাধুনিক ফ্রিজসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছিল। তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবসহ নানান জটিলতায় এ ব্যাংকের কার্যক্রম সেভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আনুষ্ঠানিক অনুমতির জন্যও বর্তমানে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

আমার বাচ্চা এনআইসিইউতে, সে তেমন খেতেও পারত না। কিন্তু আমার বুকে প্রচুর দুধ, তা ফেলে দিতে কষ্ট হতো। অন্যদিকে চোখের সামনে অন্য বাচ্চাদের শুধু একটু দুধের জন্য কান্না কোনোভাবেই সহ্য করতে পারতাম না।

মজিবুর রহমান বলেন, বর্তমানে এনআইসিইউতে ভর্তি আছে ২৫ জন। ক্যাঙারু মাদার কেয়ারে আছে ৭ জন নবজাতক। গত তিন বছরে রাস্তায় বা হাসপাতালে ফেলে যাওয়া ৩৯ নবজাতককে এ হাসপাতালে ভর্তি করে সুস্থ করা হয়েছে। এদের বাঁচাতে মায়ের দুধ খুব জরুরি ছিল। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে মায়েরাই ছুটে আসেন অন্য নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়াতে। মায়েরা এটাকে পুণ্যের কাজ বলেই মনে করেন। তবে হাসপাতালগুলোতে সেভাবে তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। তাই কোন মা কোন নবজাতককে দুধ খাওয়ালেন, তার তথ্যও রাখা যাচ্ছে না; যা ভবিষ্যতে মুসলিম ধর্মীয় মতে বিয়েসংক্রান্ত জটিলতার তৈরি করতে পারে। দেশে প্রতিষ্ঠিত মিল্ক ব্যাংক থাকলে এই জটিলতা এড়ানোও সম্ভব। মিল্ক ব্যাংকে সব তথ্য দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ করা হবে।


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, বাড়ি ৭/১, রোড ১, পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft