শনিবার, ১৯ জুন, 2০২1
নতুন সময় ডেস্ক
Published : Sunday, 6 June, 2021 at 4:42 PM
গামছা পার্টির দৌরাত্ম্যে রাতের ঢাকা ভ'য়ঙ্কর

গামছা পার্টির দৌরাত্ম্যে রাতের ঢাকা ভ'য়ঙ্কর

গামছা পার্টি, রাজধানী ঢাকার শহরজুড়ে গভীররাতে যাদের তৎপরতা শুরু হয়। নগরবাসীদের মধ্যে যারা কাজ শেষ করে গভীর রাতে বাড়ি ফিরতে যান, তারাই সাধারণত এই চক্রের কবলে পড়ে প্রাণটা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেন।

রাতে যাত্রীবাহী পরিবহন না পেয়ে যারা বেকায়দায় পড়ে যান তারাই এই গামছা পার্টির টার্গেট। বেকায়দায় পড়াদের সহায়তার নামে এগিয়ে আসেন একশ্রেণির সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক, তারাই মূলত গামছা পার্টির সদস্য। সিএনজিতে উঠা যাত্রীদের তুলে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় এই অপরাধ চক্রের সদস্যরা। ওই সময়ে বাধা দিলেই গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, গত দেড় বছরে গামছা পার্টি কেড়ে নিয়েছে অন্তত ১৬ জনের প্রাণ। যাদের মধ্যে রয়েছেন ঝালমুড়ি বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও। বিভিন্ন সময়ে গামছা পার্টির ৬ সদস্য পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি’র কোন পরিবর্তন ঘটেনি। এই অপরাধ চক্র প্রতিরাতেই বেপরোয়াভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।
তানিয়া আক্তার ৪ সন্তান নিয়ে রাজধানীর তুরাগের ধউর এলাকার ১০ ফিট বাই ৮ ফিটের এ ছোট্ট ঘরটিতে মাসিক ৩ হাজার টাকায় ভাড়া থাকেন। ৫ মাসের বকেয়া ভাড়ার খড়গ তার মাথার ওপর। বাড়িওয়ালা খুলে নিয়ে গেছেন ফ্যান, টিভিসহ অন্যান জিনিসপত্র। তানিয়ার সংসারে একসময় সুখ ছিল, ঝালমুড়ি বিক্রেতা স্বামী আজাদ পাটোয়ারি ভালোই রোজগার করতেন। কিন্তু গামছা পার্টি কেড়ে নিয়েছে আজাদের প্রাণ। তানিয়ার মতো সোনিয়ার স্বামীকেও কেড়ে নিয়েছে গামছা পার্টি। স্বামী হারিয়ে দুই সন্তান নিয়ে তিনি এখন ঠাঁই নিয়েছেন বাবার বাড়িতে।

২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৬ মে এই দেড় বছরে গামছা পার্টির হাতে প্রাণ গেছে ১৬ জনের। সবশেষ ৬ মে রাজধানীর খিলক্ষেত ফ্লাইওভারের ওপর থেকে গলায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় সুভাষ চন্দ্র সূত্রধর নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ নিশ্চিত হয় গামছা পার্টিই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

১৭ মে রাতে খিলক্ষেত এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে ছিনতাইকালে একটি চক্রের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে পুলিশের। দুই ছিনতাইকারী হাতেনাতে গ্রেপ্তার হয় এবং আরও দুজন কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃত দু’জন স্বীকার করেছে, কীভাবে তারা মানুষের কাছ থেকে জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়েছে। গভীর রাতে এ চক্রটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বের হয় যাত্রীর সন্ধানে। আগেই গাড়িতে থাকে চক্রের দু‘জন। যাত্রী হিসেবে তুলে কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরা হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় সব। বাধা দিলেই শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয় নির্জন কোনো ফ্লাইওভারে।’

গামছা পেঁচানো অবস্থায় এখন পর্যন্ত যতগুলো লাশ পাওয়া গেছে তার সবই রাজধানীর ফ্লাইওভারে। কারণ ফ্লাইওভারগুলোতে নেই কোনো সড়ক বাতি, নেই সিসি ক্যামেরা। পুলিশ বলছে খুব দ্রুতই পুরো রাজধানী সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (উত্তর) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘এই জুনের মধ্যেই পুরো ঢাকা শহরের প্রতিটি জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানো ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে কোনো অপরাধ কাণ্ড ঘটার পর যতো দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নিতে পারব।’

শনিবার (৫ জুন) দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গামছা পার্টির বিষয়টি জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার। তিনি বলেন, ‘একটি ডাকাতির মামলার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে এ চক্রটির সন্ধান মিলেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মাধ্যমে প্রাইভেটকার চুরি করলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। অন্য মামলার তদন্তে তাদের চক্রের সদস্য হাবীব মিয়াকে গ্রেপ্তরের পর এ তথ্য বেরিয়ে আসে।’

এ কে এম হাফিজ আক্তার আরও বলেন, ‘উত্তরা পূর্ব থানায় ডাকাতির মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে একটি চক্র আছে যারা কৌশলে প্রাইভেটকার ভাগিয়ে নিয়ে অল্প দামে বিদেশ থেকে দেশে কয়েক মাসের জন্য ঘুরতে আসা প্রবাসীদের কাছে ওই সব গাড়ি বিক্রি করে দিচ্ছে। এমন তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে হাবীব মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল নরসিংদী ও কুমিল্লা জেলার একাধিক স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের আরও ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, মীর মিজান মিয়া, মো. হাবিব মিয়া, মো. ফারুক, কামাল মিয়া, মো. আল আমিন ও মোবারক। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ছিনতাইকৃত একটি মাইক্রোবাস উদ্ধার করে ডিবি।

গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথামিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘গত ২১ এপ্রিল গ্রেপ্তার হাবিব মিয়া তার বিদেশফেরত এক আত্মীয়কে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে আনার কথা বলে কিশোরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে একটি হায়েস মাইক্রোবাস ভাড়া করেন। পরদিন ২২ এপ্রিল আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মাইক্রোবাসচালক মো. আবুল বাশার গ্রেপ্তার হাবিবের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী করিমগঞ্জ থানা এলাকা থেকে ৪ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা দেন। ওই দিন রাতে আনুমানিক ১১টায় তাদের বহনকৃত মাইক্রোবাসটি ঢাকার আব্দুল্লাহপুরে পৌঁছলে অজ্ঞাতনামা যাত্রীবেশে গ্রেপ্তারকৃতরা লুঙ্গি, গামছা ও দড়ি দিয়ে চালকের হাত-পা বেঁধে মাইক্রোবাসের নিয়ন্ত্রণ তারা নিয়ে নেয়।’


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, বাড়ি ৭/১, রোড ১, পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft